স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি বিপ্লবী চে' গুয়েবারার দু'টি চিঠি


.



কিউবার সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ে বসে ১৯৫৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধা (নায়ক) বিপ্লবী চে গুয়েভারার কিউবার রণাঙ্গন থেকে স্ত্রী হিল্দা গাদিয়াকে লেখা একটি চিঠি।


প্রিয়তমা বৃদ্ধা,
কিউবার জঙ্গলে বসে জ্বলন্ত মার্তিতুল্য কয়েকটা কথা লিখে পাঠাচ্ছি তোমাকে। আমি বেঁচে আছি এবং ছটফট করছি রক্ততৃষ্ণায়। এখন তুমি আমাকে একজন সাচ্চা সৈনিক বলতেই পারো (সারা গা ময়লায় ভর্তি, পোশাকের হাল শতেকছেঁড়া ) কারণ এই মূহুর্তে আমার লেখার টেবিল হচ্ছে একটা থালা, কাঁদে ঝুলছে বন্দুক আর ঠোঁটের ফাঁকে নতুন প্রেম-চুরুট। সবকিছু খুব মসৃণভাবে ঘটেনি। এতদিনে তুমি নিশ্চয় জেনে গেছো যে ‘গ্রান্‌মা’-য় চড়ে (এত ঠাসাঠাসি করে বসতে হয়েছিল যে শ্বাস নেওয়ারও জো ছিল না ) রওনা হওয়ার সাতদিন পর আমাদের নাবিকের ভুলে নোংরায় ভরা একটা জংলা জায়গায় এসে ভিড়তে হয়েছিল আমাদের। দুর্ভোগ তখনও শেষ হয়নি। কুখ্যাত আলেগ্রিয়া দেল পিও অঞ্চলে সরকারি সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়ে একদল পায়রার মতন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে হয়েছিল আমাদের। আমার কাঁদের কাছে আঘাত লেগেছিল, নেহাত বেড়ালের মতো আমারও অনেকগুলো প্রাণ বলেই বেঁচে আছি। মেশিনগানের গুলিটা আমার বুকের কাছে ঝোলানো কার্তুজের খোপে লেগে ঠিকরে গিয়ে কাঁদের কাছে আঘাত করেছিল। তারপর দিনকয়েক পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আঘাতটা তখন বেশ গুরুতরই মনে হচ্ছিল, কারণ কাঁদের ক্ষতটা ছাড়া বুকেও খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। তোমার পরিচিতদের মধ্যে একমাত্র জিমি হার্তজেল মারা গেছে। ও আত্মসমর্পন করেছিল,তবু তাকে হত্যা করেছে ওরা। পুরো সাতটা দিন আমি ঘুরে বেড়িয়েছি আল্‌মিদা আর রামিরিতো-র সঙ্গে-ওদের দুজনকেই তো চেনো তুমি। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে, তেষ্টায় ছাতি ফাটছে। শেষমেশ ঘেরাও ভেঙ্গে বেরিয়ে কৃষকদের সাহায্যে ফিদেলের কাছে এসে পৌঁছাই (ওরা বললো বেচারি নিকো-ও নাকি মারা পড়েছে, তবে এ ব্যপারে আমরা এখনও নিশ্চিত নই ) নিজেদেরকে গুছিয়ে নিতে, অস্ত্রশস্ত্রে সজিত করে তুলতে বিস্তর মেহনত করতে হয়েছে। তারপর সেনাবাহিনীর একটা ঘাঁটিতে হানা দিয়ে কয়েকজন সৈন্যকে হতাহত করি আমরা, বাকিদের বন্দী করা হয়। মৃতদেরকে রণক্ষেত্রেই রেখে এসেছি। তার খানিকক্ষণ পরে আরও তিনজন সৈন্যকে বন্দী করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে যদি যোগ করো যে এই লড়াইতে আমাদের পক্ষের একজনও মারা যায়নি আর এই পাহাড়ের বুকে তোফা আরামেই আছি আমরা, তাহলেই বুঝতে পারবে ওদের সৈন্যদের মনোবলের হালটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ওরা কিছুতেই চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলতে পারবে না আমাদের। তবে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, সামনে এখনও অনেক লড়াই, কিন্তু পাল্লাটা ইতোমধ্যেই আমাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে আর প্রতিদিনই আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছে আমাদের দিকে।

এবার তোমার কথা। তুমি এখনও আগের ঠিকানাতেই আছ কি না, কোন ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে হবে, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা, জানিও। বিশেষ করে জানিও ‘আমাদের ভালবাসার সবথেকে কোমল পাপড়িটা’-র কথা। ওর ছোট্ট ছোট্ট হাড়ে যতটা সয়, ততটা নিবিড় করে আমার হয়ে আলিঙ্গন আর চুমু দিও ওকে।

তাড়াহুড়োয় তোমার ছবিগুলো পান্চো-র বাড়িতে ফেলে এসেছি। ওগুলো পাঠিয়ে দিয়ো। তুমি আমাকে কাকার ঠিকানায় কিংবা পাতোজো-র ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে পারো। পেতে একটু দেরি হতে পারে, তবে পেয়ে যাবো ঠিকই।"

তোমার
চে


বিপ্লবী চে গুয়েভারা তার সন্তানদের কাছে ১৯৬৫ সালে (যে বছর আমার জন্ম হয়) লেখা একটি চিঠি এখানে তুলে ধরলাম।
আমার সন্তানদের প্রতি
প্রিয়,
হিলদিতা, আলেইদিতা,কামিলো,সিলিয়া আর আর্নোস্তো।

এ-চিঠি যদি তোমরা কখনো পড়ো, তাহলে জেনে নিয়ো-আমি আর তোমাদের মাঝে নেই।
আমার কথা তোমাদের খুব বেশি মনে থাকবে না। পুঁচকেগুলো তো কিছুই মনে করতে পারবে না।
তোমাদের বাবা বরাবর তার নিজের মত অনুযায়ীই চলেছে, নিজের বিশ্বাস অনুযায়ীই কাজ করে গেছে।
তোমাদেরকে ভালো বিপ্লবী হয়ে উঠতে হবে। মন দিয়ে পড়াশুনা কোরো, যে-সব প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারি সেগুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা কোরো। মনে রেখো, বিপ্লবের থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমরা প্রত্যেকে নিতান্তই তুচ্ছ।

আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, পৃথিবীর যে-কোন প্রান্তে কোনো অন্যায় ঘটেছে শুনলে তা যেন তোমাদের নাড়া দেয় অগভীরভাবে। এটাই হচ্ছে বিপ্লবীদের সব থেকে বড় গুণ।
আমার সন্তানরা, এবার বিদায়ের পালা। আশাকরি আবার দেখা হবে তোমাদের সংগে।
তোমাদের বাবা তোমাদের জন্যে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিশাল একটা চুমু আর দীর্ঘ আলিঙন।"

তোমাদের বাবা

বি: দ্র: চিঠিটি প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর।