আমাকে নিয়ে লেখা


.

ওয়াদুদ ভূইয়া : আদর্শ জননেতার প্রতিভূ

ড. আবদুল জলিল

রাজনীতিবিদ, নেতা, বন্ধু, সংগঠক, সাধারণ মানুষ, প্রশাসক, কলামিস্ট, বাগ্মী, শিক্ষাবিদ, সংসদ সদস্য, ছাত্র, দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, উদারতা যে দিক হতে বিবেচনা করা হোক না কেন, নিবিড় পর্যালোচনায় ওয়াদুদ ভূইয়া যে কোন বিবেচনায় অনবদ্য, নিরূপম এবং অসাধারণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত নির্দাগ চরিত্রের অধিকারী একজন প্রমুগ্ধ জননেতা। একজন মানুষকে যে সকল গুনাবলী উন্নত রাজনীতিবিদ, বিখ্যাত নেতা এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার সব গুণাবলী ওয়াদুদ ভূইয়ার রয়েছে। ক্ষমতার বিজ্ঞোচিত ব্যবহারে তার মত সুদক্ষ নেতার বড় অভাবে দেশে। অহংবোধ, প্রতিশোধপরায়নহীন মনোভাব, বলিষ্ঠ চরিত্রের পাহাড়সম দৃঢ়তা তাকে গড়ে তুলেছে একজন আকর্ষণীয় মানুষ হিসেবে। যেই তার সান্নিধ্যে গিয়েছেন সেই মুগ্ধ হয়েছেন কোন না কোনভাবে। যা তাকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।



ওয়াদুদ ভূইয়াকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কম। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি অবিসংবাদিত নেতা এবং নির্মল চরিত্রের একজন অনবদ্য মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি একজন খাঁটি মানুষ, খাঁটি বন্ধু, যার চিন্তা চেতনা পাহাড়ি সবুজের অন্তহীন প্রশান্তির মত প্রশস্ত এবং প্রকৃতির মত আকর্ষণীয়। বাল্যকালে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা হতে শুরু করে রাজনীতি এবং প্রাত্যাহিক জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে ওয়াদুদ ভূইয়া মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত একজন উদার মনের পরিচ্ছন্ন মানুষ। গ্রহণের বিশাল ক্ষমতা তাঁকে আলোর মতো নিবিড় আর আকাশের মতো অপরিমেয় করে তুলেছে। সময় তার জীবনের অবয়ব, কর্ম অলঙ্কার। তার কাছে জীবন প্রকৃতির দান কিন্তু উন্নত জীবন-যাপন কর্মের উপহার। তাই তিনি জীবনকে শুধু সময় দিয়ে নয়, কর্ম ও অধ্যবসায়ের সমন্বিত প্রতিবিম্বে বিভূষিত করার প্রত্যয়ে দৃপ্ত রাখাকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছার অন্যতমম উপায় মনে করেন। সবাইকে এমনই উপদেশ দেন তিনি। ওয়াদুদ ভূইয়া একজন ভালো বন্ধু। আদর্শ মানুষ না হলে কারও পক্ষে ভালো বন্ধু হওয়া সম্ভব নয়। কাজ, আনন্দ, বিশ্রাম ও
সাংস্কৃতিক অনুপ্রয়াস সবখানে তিনি সাবলীল, সবসময় নান্দনিক। অহঙ্কার করার সকল উপাদান থাকা সত্ত্বেও তিনি সাধারণে মিশে যাবার প্রাবল্যে উদ্বেল। এত উদার, নিরহঙ্কার, অমায়িক ও সজ্জন ব্যক্তি বর্তমানে বিরল। অনেকের মাঝে তাঁকে অনুকরণ করার ইচ্ছা দেখেছি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে তাঁকে অনুকরণ করা কারও পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি অনন্য ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। অনুসারী, ভক্ত এবং সহকর্মীদের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম প্রেরণার আলেক্ষ্য। তিনি মনে করেন, খরভব রং াবৎু াবৎু ংযড়ৎঃ, নঁঃ ঃযবৎব রং ধষধিুং ঃরসব বহড়ঁময ভড়ৎ পড়ঁৎঃবংু. তাই তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করার চেষ্টা করেন। যা একজন রাজনীতিবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ছাত্র জীবন হতে তিনি মেধাবী, বুদ্ধিমান ও অমায়িক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্যবহারে যেমন ছিলেন বিনয়ী তেমনি ধীর। আলোচনায় শান্ত কিন্তু যৌক্তিক। আচরণে শিষ্ট কিন্তু বিচক্ষণতায় তীক্ষ্ণ। দুর্বলের বন্ধু, অত্যাচারিতের প্রতি কঠোর। তার দৈহিক গড়ন মোগল রক্তধারায় অবগাহিত। চেহারায় সবাক মাধুর্য্য অনিবার্য মুগ্ধতার আদুরে লাস্য যেন। এখনকার মত ছাত্র জীবনেও মুখটা কিছু নিচু অথচ সটান হয়ে রাজপুত্রের মতো চলাফেরা করতেন। এলাকায় ভূইয়া পরিবার যেমন ছিল প্রভাবশালী তেমনি ছিল সৌহার্দ্যময় ও দুঃস্থ বান্ধব। তাঁর কণ্ঠ ছিল মোলায়েম ও মার্জিত। সহজে কারও সাথে রূঢ় ভাষায় কথা বলতেন না। সকল সহপাঠী ও সতীর্থ তাকে বিনয়ী, পরপোকারী এবং বিপদের সহায়ক পরম বন্ধু মনে করতেন। সিনিয়র-জুনিয়র সবার প্রতি যথাযোগ্য আচরণ এবং বিনয়ের সাথে রাজকীয় জৌলুসের মিশ্রণ ছাত্র হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়াকে বিরল মাধুর্য্যে মন্ডিত করে তুলেছিল। সে ছোটবেলা থেকে শুরু তার নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ।

তার কয়েকজন শিক্ষকের ভাষায়, ছাত্র হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়া ছিলেন মেধাবী, ধীর, ভদ্র, সজ্জন এবং সহানুভূতিশীল। বিদ্যালয়ের, শ্রেণির অনেক অসহায় ছাত্রকে তিনি সাহায্য করেছেন, তার পরিবারের মাধ্যমে সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অনেক শিক্ষকের আর্থিক সংকটেও ওয়াদুদ ভূইয়া উদার মনে এগিয়ে এসেছেন। তিনি নিজের ক্ষতি করতে পারেন, তবে অন্য কারও নয়। সৃষ্টির সব কিছুর প্রতি তিনি মমত্বশীল। আমাদের চারিপাশে যা আছে সব কিছুতে তার দৃষ্টি আলোর মতো অবিরাম, বৃষ্টির মতো স্নাত, বিকেলের রোদের মতো ঈষদুষ্ণ।’ তার ছাত্র-জীবনের বন্ধু ইকবালের ভাষায় বলা
যায়, ওয়াদুদ ভূইয়া সবসময় উচ্ছল, সবসময় আন্তরিক, কথা ও কাজে বিন্দুমাত্র ফাঁক থাকে না। বন্ধু হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে আলম বলেন, গু রফবধ ড়ভ মড়ড়ফ পড়সঢ়ধহু রং ঃযব পড়সঢ়ধহু ড়ভ পষবাবৎ, বিষষ-রহভড়ৎসবফ ঢ়বড়ঢ়ষব, যিড় যধাব ধ মৎবধঃ ফবধষ ড়ভ পড়হাবৎংধঃরড়হ; ঃযধঃ রং যিধঃ ও পধষষ মড়ড়ফ পড়সঢ়ধহু.

কৃতজ্ঞতাকে মানবতার সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ বলা হয়। ওয়াদুদ ভূইয়া কৃতজ্ঞতামনস্কতার উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত। কেউ তাঁর সামান্য উপকার করলে তিনি বহুভাবে বহুগুনে তার প্রকাশ ঘটান। তিনি মনে করেন, এৎধঃরঃঁফব রং ঃযব ভধরৎবংঃ নষড়ংংড়স যিরপয ংঢ়ৎরহমং ভৎড়স ঃযব ংড়ঁষ. তিনি বাঙ্গালি, উপজাতি, অ-উপজাতি নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের প্রতি, প্রকৃতির মত গভীর অনুপমতায় কৃতজ্ঞ। হয়ত তাই কারও ক্ষতি করতে পারেন না। জীবনে তার প্রধান লক্ষ্য পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সকল মানুষ, প্রকৃতি এবং পরিবেশের পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা। তিনি তার প্রিয় পার্বত্য এলাকাকে এমন একটি শান্তি ও সমৃদ্ধময় জনপদ হিসেবে দেখতে চান যেখানে জাতিধর্ম, বর্ণ, উপজাতি-অউপজাতি নির্বিশেষে সবাই শান্তিপূর্ণ সহবস্থানে বসবাস করবেন।



মূলত ওয়াদুদ ভূইয়া রাজনীতিবিদ হয়েও নিরপেক্ষতার ভূষণ। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন আদর্শ বিচারক ও নিরপেক্ষ প্রশাসকের ন্যায় সমতারভিত্তিতে বিধিগত ন্যায্যতায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। রাজনীতি বা দলের প্রতি অনুগত থেকে কীভাবে দেশের উন্নয়ন করা যায় সেটিই রাজনীতিক আদর্শের গন্তব্য। এরূপ নিরপেক্ষতা কেবল বিচারের নিক্তিতে পরিমাপ্য। রাজনীতিক পরিমন্ডলে রাজনীতিক পদ বিন্যাসে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ থাকা খুবই কঠিন। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া এ কঠিন কাজটিই করছেন। এ জন্য তাকে প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এক কথায় বলা যায়, রাজনীতিক দলের সক্রিয় নেতা হয়েও ওয়াদুদ ভূইয়ার নিরপেক্ষতা সর্বাঙ্গীন সুন্দর। তাঁর ভাষা, কথা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অসাধারণ। যে কোনো মুহূর্তে যে কোন বিষয়ের উপর যে কোনো প্রশ্নের এমন উত্তর দেন যা প্রশ্নকারী, শ্রোতা এবং পক্ষ-বিপক্ষ সবাইকে সন্তুষ্ট করার উপাদানে ভরপুর থাকে। কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পায় না।’ ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন ন্যয়বান ও নিরপেক্ষ। রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হলে সবাই ওয়াদুদ ভূইয়াকে বিচারক হিসেবে মেনে নিত। এবং তিনি নিরপেক্ষভাবে ন্যায়ভিত্তিক সমাধান দিতেন। এ গুণটা তাঁর মাঝে এখন আরও বেশি পরিস্ফুট, আরও বেশি দৃশ্যমান।

পার্বত্য এলাকা বাংলাদেশের একটি বিশেষ এলকা। এ এলাকার প্রশাসন ও আর্থসামাজিক অবস্থা সমতল হতে ভিন্ন। এলাকাটি বাঙ্গালি-অবাঙ্গালিসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় পদচারণায় মুগ্ধ। তিনি মনে করেন, শান্তি আর নিরাপত্তার কোন বিকল্প নেই। মানুষ যতই সম্পদশালী হোক না কেন, শারীরিক সুস্থতা না থাকলে তা পুরো মূল্যহীন। তেমনি একটা জাতি বা জনগোষ্ঠী কিংবা এলাকার জনগণ স্বার্থ কিংবা অর্থের জন্য যদি নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট করার প্রয়াসে লিপ্ত হয় তখন সকল নিরাপত্তা আর শান্তি ব্যাহত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোন কেউ শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। কলহ-কোন্দল তাই সবসময় পরিত্যাজ্য। তাই পার্বত্যবাসীর প্রতি তার উদাত্ত আহবান সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধৈর্য্যে শান্তি বজায় রাখা। তিনি মনে করেন, পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠ পরস্পর সম্প্রীতি, শান্তিময় সহবস্থান, সমঝোতা ও পরমত নির্ভরশীলতার সাথে বাস করতে পারলে পার্বত্য এলাকা পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধশীল এলকায় পরিণত হবে।



ওয়াদুদ ভূইয়া, ভূইয়া পরিবারের গর্ব, পার্বত্য এলাকার অবিসংবাদিত নেতা। রামগড়ে তিনি অজাতশত্রু। খাগড়াছড়িতে জননেতা, পার্বত্য এলাকার আধুনিকতার জনক। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ প্রশাসক এবং সমগ্র বাংলাদেশে মার্জিত মননশীলতার অধিকারী একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি শহিদ জিয়ার আদর্শের একজন একনিষ্ঠ কর্মী বাংলাদেশ ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রাণদাতা। তার হাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল জন্ম নিয়েছে নব দিগন্তের উল্লাস বিলাসে। তার পূর্বেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ছিল। সেটি ছিল কঙ্কালের মত একটি নিষ্ক্রিয় অবকঠামো, ঠিক কঙ্কালের মত ধীরে রূপ নিচ্ছিল। খাগড়াছড়িতে বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অবস্থা ছিল আরও করুণ। খাগড়াছড়িতে শহিদ জিয়ার রাজনীতিক দর্শনের প্রচার ও প্রসারে কিশোর ওয়াদুদ ছিলেন অনিবার্য অনুঘটক। রামগড় খাগড়াছড়িতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার প্রসারে ওয়াদুদ ভূইয়ার কথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ জিয়াও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, স্বীকৃতি পেয়েছেন ওয়াদুদ ভূইয়া। সে বয়সে একজন রাষ্ট্রপতির নিকট হতে অমন স্বীকৃতি অর্জণ ছিল অনবদ্য বিষয়। শহিদ জিয়া বলেছিলেন: ওয়াদুদ, তুমি অসাধ্য সাধন করেছো। শহিদ জিয়ার মতে, ‘দলের প্রতি নিবেদিত এমন তরুণ ছাত্র নেতা খুব কম আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে রামগড় কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ওয়াদুদ ভূইয়া যে রাজনীতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী ছিলেন তা ছিল অবিশ্বাস্য। অন্য কেউ হলে হয়ত নিজেকে সংবরণ করতে পারতেন না। কিন্তু তিনি সকল লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দলের প্রতি নিবেদিত ছিলেন নির্ভর ব্যক্ততায়। আত্মবিশ্বাস ছিল তার প্রবল, সাধণা ছিল অনল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির উপজেলা রামগড়ে তার জন্ম। চারিদিকে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী, কোনদিন তাদের কারও সাথে বিরোধ হয়নি। শিশু বয়সে শিখে নিয়েছিলেন চাকমা ভাষা। এটি ছিল তার সার্বজনীনতার নির্বাণ। এমন কয়জনে পারে!! এখনও তার মননশীলতায় সে বোধ জাগ্রত-পাহাড়ি বাঙ্গালি ঠিক ব্যক্তির মত পৃথক কিন্তু বার একটিই , তা হলো মানুষ, মানুষ, মানুষ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালিদের কাছে যেমন তিনি প্রিয় তেমনি প্রিয় উপজাতীয়দের কাছে। তত্ত্বাবধায়ক নামীয় সামরিক সরকারের আমলে তাকে অন্যান্য নেতাগণের ন্যায় মিথ্যা অজুহাতে গ্রেফতার করা হলে তার মুক্তির দাবিতে বাঙ্গালি চেয়ে অধিকমাত্রায় জেগে উঠেছিলেন উপজাতীয় গোষ্ঠী। তিনি এখনও তাদের সে অবদানের কথা শ্রদ্ধা আর প্রশংসাভরে স্মরণ করেন। উপজাতীরা তাকে মনে করেন বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। তিনি বিএনপি করেন। এটি কারও নিজস্ব দল নয়, আমজনতার দল। শহিদ জিয়া এভাবে চিন্তা করতেন। তাই তিনিই প্রথম বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহিদ জিয়ার নিবিড় অনুসারী হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার কাছে দল নয়, দেশই বড়। মানুষ নয়, কর্মই বিবেচ্য। এটিই তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা সবাইকে মুগ্ধ করে।

সহানুভূতি মানব জীবনের একটি অনবদ্য গুণ। খুব কম প্রাণির মধ্যে এটি দেখা যায়। একজন মানুষের মনুষ্যত্ব যে বিষয়টা দিয়ে সবচেয়ে বেশি পরিস্ফুট হয় সেটি সহানুভূতি। ওয়াদুদ ভূইয়া ব্যক্তি হয়েও যেন সহানুভূতির এক অনুপম দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে তার ছাত্রকালীন ইতোপূর্বে বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরও বহু উদাহরণ টানা যায়। তার সহায়তায়, তার পিতামাতার বদান্যতায় কত গরিব ছাত্রছাত্রী যে অধ্যয়ন করে জীবনে প্রতিষ্ঠা হয়েছেন তা এখনও রামগড়বাসীর মুখে মুখে প্রচলিত।


সময়বোধ ও কর্তব্যপরায়নতার উজ্জ্বল আলেখ্য ওয়াদুদ ভূইয়া। যেখানে থাকুন এবং যে কাজই করুন না কেন, সময়মত পূর্ব নির্ধারিত স্থানে গিয়ে হাজির হন। জননেতা হিসেবে অধিকাংশ সময় জনসংযোগে ব্যস্ত থাকলেও সরকারি দায়িত্বে তিনি কখনও অবহেলা করেননি। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন যথাসময়ে শেষ করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন এক কর্মকর্তার কথা এখানে প্রণিধানযোগ্য- তিনি রাজনীতি করেন, নিজস্ব অফিস করেন, সভা সমিতি করেন, দর্শনার্থীদের সময় দেন; পরিবার-পরিজন আছে, তাদেরকেও পর্যাপ্ত সময় দেন এতকিছুর পরও সবকিছু কীভাবে যথাসময়ে করেন ভেবে বিস্মিত হই।”

অনেক লোক আছে তাদের সবসময় ব্যস্ত দেখা যায়, অথচ কাজের মতো কোনো কাজ থাকে না, অযথা ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজেকে মূল্যবান ভাবানোর চেষ্টা করে। ওয়াদুদ ভূইয়ার মধ্যে এ জিনিসটি কখনও দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, ব্যস্ততা কাজের জন্য, অকাজের জন্য নয়। যারা কাজের নামে অকাজ করে তারা নেতা নন, নেতা হবার ভান করেন মাত্র। ব্যস্ততা দেখানোর কোন বিষয় নয়, দেখার বিষয়। কাজ করতে করতে ব্যস্ততা নীরবে চলে আসে। এ অবস্থায় সকল কাজ আনন্দময় হয়ে উঠে। ওয়াদুদ ভূইয়ার ভাষায়: ‘কাজ করাকে অনেকে কষ্টকর মনে করেন। আমি জীবনে কখনও কাজকে কষ্ট মনে করিনি, আনন্দ মনে করেছি। সকল কাজ আনন্দ নিয়েই করেছি। কাজই আমার আনন্দ, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না। যারা কাজকে কষ্টকর মনে করে তাদের প্রতি মুহূর্ত কাটে মৃত্যু কষ্টে। কাজ জীবনের নিঃশ্বাস, স্থায়ীত্বের প্রশ্বাস। তাই সব কিছু ধীরস্থিরভাবে করা উচিত। এ জন্য তিনি কিছুকে, কোন ব্যক্তি তিনি যত সাধারণই হোকন না কেন সবাইকে গুরুত্ব দেন, শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন, স্নেহ করে।


কাজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব একটা সূত্র রয়েছে। সেটি তিনি আব্রাহাম লিংকনের কাছ থেকে পেয়েছেন, শানিত করেছেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মে। প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে সামর্থ্য, তারপর উদ্দেশ্য। এ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারপর বেছে নিতে হবে পছন্দ। এরপর বিবেচনা, তারপর সিদ্ধান্ত। সবার শেষে কার্য সূচনা। এ সব না ভেবে যদি তাড়াহুড়ো করে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করা হয় তা হয়ত সাময়িক ফলদায়ক হতে পারে কিন্তু দীর্ঘ বিবেচনায় তা কখনও কল্যাণকর হতে পারে না। বাংলাদেশে রাস্তাঘাট, ভবন কিংবা পরিকল্পনা প্রণয়ণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে চিন্তা করা হয় না। তাই প্রতিনিয়ত দেশকে, জনগণকে এবং রাষ্ট্রকে ভুগতে হয়। একজন প্রকৃত নেতা, প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কাজ করেন না। এটি অনেকটা নিজের চোখ নিজে তুলে ফেলার মত অবিমৃষ্যকরতা। তিনি মনে করেন-Work is not punishment. It is reward, strength pleasure. কর্মে তিনি স্ফটিকের মত স্বচ্ছ ও গণিতের মতো আক্ষরিক, চিন্তায় প্রয়োজনের মতো গতিশীল, ভালোবাসায় পিতার মতো লাস্যময়, স্নেহে জননীর মতো সুবিনয়; বিপদে চাকার মত ধৈর্য্যশীল। এগুলোই নেতার গুণাবলী। এ সব যার নেই তার নেতা হবার যোগ্যতাও নেই। তিনি আগামীকালের অপেক্ষায় থাকেন না, আগামীকাল কখনও আসে না। এমনকি তিনি এতই আত্মবিশ্বাসী যে, সাফল্যের জন্যও অপেক্ষা করেন না। সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করার সময় তাঁর নেই। তার কাজ এগিয়ে চলা, শুধু এগিয়ে চলা। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে সাফল্যই তাঁর পিছু নেয়। তিনি লক্ষ্যে স্থির। কোথাও তাড়াতাড়ি পৌঁছার চেষ্টা করার আগে কেন, কোথায়, কীভাবে এবং কখন যেতে হবে সেটিই আগে স্থির করে নেন। তাই তাঁর লক্ষ্য চ্যুত হয় না, সময় অপচয় হয় না।


ওয়াদুদ ভূইয়া সময়পুষ্ট একজন স্বসৃষ্ট মানুষ। এতদূর এসেছেন নিজের চেষ্টায়, নিজের যোগ্যতায়। কারও করুণায় নয়। তিনি অতীতের জন্য আফসোস করেন না এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে অস্থিরও হন না। যারা অতীত নিয়ে ভাবেন এবং ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত থাকেন তাদের বর্তমানটাই জাহান্নামের মত অসহ্যময় হয়ে উঠে। তাই ওয়াদুদ ভূইয়ার অতীত-ভবিষ্যত শুধু পথ চলার প্রেরণা, ভাবার বিষয় নয়। এজন্য যে কোন বিপদে তিনি অবিচল থাকতে পারেন। ওয়াদুদ ভূইয়া মনে করেন, কর্ম, জয়-পরাজয় ও ত্যাগ এ তিনটির কার্যকর সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে জীবনের যে কোন লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি এগুলোর সমন্বয়ে সকল পার্বত্যবাসীর কল্যাণে নিবেদিত থেকে জীবনের প্রতিটি বিষয়কে উপভোগ করেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের নির্মল আনন্দে। লক্ষ্য ভেদকে ওয়াদুদ ভূইয়া গন্তব্যস্থল মনে করেন না। মনে করেন পরবর্তী যাত্রার বিমুগ্ধ হাতছানি। আরও দ্রুত এবং লম্বা পথ পাড়ি দেয়ার তাগিদ। পথ যত লম্বা হোক তিনি সেদিকে নজর দেন না। যার আরম্ভ আছে তার শেষও আছে। যত বড় জিনিসই হোক না কেন, বিন্দু হতে সব কিছুর সূচনা। যেখানে পুরাতনের অন্তিমতা সেখানে নবত্বের সূচনাগার। পুরাতনের জন্য অহেতুক আফসোস করে সময় নষ্ট করা বোকামি। তাই তিনি পার্বত্যবাসীর কল্যাণে নতুনভাবে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর। এ পরিকল্পনায় আছে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা, সুযোগ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, ভ্রাতৃত্ববোধ, শান্তি এবং সুবিমল পরিবেশ সৃষ্টি করা। যে কোন মূল্যে তিনি এগুলো করার দৃঢ় প্রত্যয়ে রাতদিন কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আমি মনে করি এ বিষয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার উচিত তাঁকে ঐকান্তিকভাবে সহায়তা করা। যাতে তিনি একটি স্বপ্নময় ভ্রাতৃপ্রতিম ও সম্প্রীতিময় পার্বত্য এলাক গড়ে তুলতে পারেন। যেখানে সব গোষ্ঠীর লোক জীবনকে পরিপূর্ণ শান্তিতে উপভোগ করতে পারবেন। থাকবে না কোন দ্বেষ, ক্লেশ, হানাহানি।


ওয়াদুদ ভূইয়া হাস্যমূখের একজন অমায়িক ব্যক্তি। বলা হয় যিনি হাসতে পারেন তিনি পৃথিবীর আনন্দ, স্রষ্টা তাকে পৃথিবীকে বাগানময় করার জন্যই প্রেরণ করেছেন। ওয়াদুদ ভূইয়াও তেমন এক বিরল প্রতিভার অধিকারী হাস্যমুখর ব্যক্তিত্ব। জীবনকে কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সততার আলয়ে পরিচালনা করেন বলে তাঁর মুখে হাসির ছটা মেঘহীন রূপোলি বিকেলে মতো অবিকল লেপ্টে থাকে প্রকৃতির পরতে পরতে। তাঁর কাজ মমতায় মমতায় উদ্বেল, শাসনবিন্দু উদারতার সৌকর্ষ্যে মুখর, গ্রহণ ক্ষমতা আলোর মতো মুগ্ধকর। তার কাছে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী উপজাতি-অউপজাতি সবাই সমান। তিনি সবাইকে নিজের মত মনে করেন। মনে করেন নিজের দেহ, অঙ্গ আর পরিচালিত হন বিবেকতাড়িত বিবেচনা বোধের মাধ্যমে। তার লক্ষ্য পার্বত্যবাসীর সার্বজনীন আবাস, শান্তিমূখর সমাজ, আনন্দঘন ও উৎসবময় জীবন। যেখানে সবাই একই পরিবারের সদস্যের মত একই স্থানে পরম শান্তিতে নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারবে। এ রকম একটি পার্বত্য এলাকা গড়ে তোলাই তার জীবনের প্রথম ও শেষ লক্ষ্য। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, কলামিস্ট, সমাজ-সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী, সংগঠক, প্রশাসক ও সংসদ সদস্য এতগুলো বিষয়কে এক সাথে নিয়েও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে কোনরূপ অহমিকা বোধ ছাড়া সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যান লক্ষ্যে। ব্যাঘাত ঘটে না সংসার জীবনের। সময় দেন সবাইকে যার যেমন প্রাপ্য। উপস্থিত হন যেখানে প্রয়োজন। এত কর্মব্যস্ততার মাঝেও মুখের হাসির মলিনতা নেই। তিনি মনে করেন- এক ভালো থাকার চেয়ে মরণই শ্রেয়। তাই পার্বত্য এলাকাকে সত্যিকার অর্থে শান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলতে না পারা পর্যন্ত তার বিশ্রাম নেই, শান্তি নেই।

সময়কে যদি কর্মের মাধ্যমে প্রগতিভূত সৃষ্টির প্রতি অনুগত রেখে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য অধ্যবসায়-প্রসূত অদম্যতা বিমূর্ত করা যায়, তাহলে সে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির কাছে কোনো কিছু অসম্ভব নয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সময়ের প্রতি সতর্কতা, শেখার প্রতি আগ্রহ, সৃষ্টির প্রতি প্রেম, মানুষের প্রতি ব্যবহার দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তিকে বিচার করা হয়, তাহলে ওয়াদুদ ভূইয়া নিঃসন্দেহে একজন সময় উপযোগী আদর্শ মানুষ। মানুষের প্রতি, পার্বত্য এলাকার সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তার যে ভালবাসা মনে অনুক্ষণ অনুরিত তা যদি নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হয় তাহলে যে কেউ বলবেন, পার্বত্য এলাকার জন্য তার চেয়ে বেশি দরদ আর কারও নেই।পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষায়, “ওয়াদুদ ভূইয়া চেয়ারম্যান, আমি তার অনেক নিচের কর্মকর্তা; তারপরও কাজের ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে আমাদের একজন সহকর্মী মনে করতেন। স্নেহময়তার সাথে এগিয়ে আসতেন। কোনো উন্নাসিকতা তাঁর মধ্যে দেখিনি। তিনি কখনও রুক্ষতার সাথে আমাদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতেন না বরং না-পারলে বকাঝকার পরিবর্তে নিজে উদ্যোগী হয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য জন্য এগিয়ে আসতেন। নতুনের প্রতি সবার আবেদন চিরন্তন। তবে অনেকে নতুন কিছু গ্রহণে সাহস পান না। একটা ভীতি কাজ করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ওয়াদুদ ভূইয়া এ ব্যাপারে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকার পরিচয় দিতে সক্ষম একজন দূরদর্শী প্রশাসক। তিনি নতুন কিছু গ্রহণে কখনও ভয় পেতেন না, এখনও পান না। অপ্রিয় সত্য কথা তিনি অমায়িক বচনে প্রিয়ভাবে বর্ণনা করতে পারতেন। ফলে যার অসন্তুষ্ট হবার কথা সে-ও তেমন অসন্তুষ্ট হতো না। তার নতুনত্বকে, নতুন চিন্তা ও পরিবর্তনশীলতাকে গ্রহণ করলে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নগরে পরিণত করার সক্ষমতা রাখেন।”



কর্মপরিবেশ কর্ম সম্পাদনের অন্যতম নিয়ামক। আনন্দময় পরিবেশ কর্মকে অবসরের মতো অতুলনীয় করে তোলে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী তার নেতৃত্বে কাজ করেছেন তারা সবাই এটি স্বীকার করেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কর্মপরিবেশকে আনন্দময় করে তুলতে পারেন। মনে হয় এ জন্য তিনি এত নিবিড় ও উদয়াস্থ পরিশ্রমের পরও ক্লান্ত হন না এবং তাঁর সহকর্মীরাও বিরক্ত বোধ করেন না। শুধু তাই নয়, কাজের ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন। স্বীকৃতি উদ্দীপনাকে বর্ধিত করে। কারও কাছ হতে শুধু চাপ আর ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করার কৌশল কোনো কালে সফলকাম হয়নি। বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। ওয়াদুদ ভূইয়া বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখেন। যিনি কাজ করেন, তাকে তিনি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেন। সবার সামনে তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন। তবে কারও ভুলটা ধরিয়ে দিতেও কসুর করেন না। অনেক সময় মুখের উপর বলে দেন- তবে খুব ভদ্র ও মার্জিত ভাষায়। তিনি মনে করেন, জীবন ও কর্ম শিকলের মতো। শিকলের প্রতিটি রিঙই অপরিহার্য। কোনো একটি রিঙ দুর্বল হয়ে গেলে পুরো শিকলটাই দুর্বল হয়ে যেতে বাধ্য। তাই তিনি তাঁর কর্মীবাহিনীর প্রত্যেককে নিবিড় পরিচর্যায় দক্ষ করে তোলেন।

ওয়াদুদ ভূইয়া দেশপ্রেমিক। জাতির দুঃসময়ে আপন বলয়ে সামর্থ্যের পূর্ণ ডালা নিয়ে এগিয়ে যান মানুষের প্রয়োজনে, জাতির কল্যাণে। উজাড় করে দেন নিজের সামর্থ্য। অতীত ও বর্তমান ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তার দেশ প্রেমের প্রমাণ স্পষ্ট। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অগ্নিকান্ড প্রভৃতিসহ বিভিন্ন সামাজিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের প্রতি উজাড় করে দিয়েছেন বিত্ত, চিত্ত এবং সামর্থ্য। তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। তার পিতা ও ভাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সংগত কারণে তার মনে আছে দেশপ্রেমের অগাধ চেতনা। শিশুবেলায় দেখেছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান তার জন্ম এলাকা রামগড়ে বসে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির প্রতি অবিচল আস্থা এবং প্রগাঢ় শ্রদ্ধা তাঁর অস্থি মজ্জার অংশ। তাই বলে তিনি একমুখী নয়, বহুমুখী। সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় তার চেতনার ধারায় জন্ম থেকে বিকশিত একটি রাষ্ট্রনায়কসুলভ উন্মেষ। এ বিশ্বাসে অবিচল থেকে দেশের কল্যাণে, মানুষের মঙ্গলে উদাত্ত মাধুরিমায় স্বাধীনতার স্বাদকে পরিপূর্ণ আনন্দে উপভোগের ক্ষেত্র প্রস্তুতে তিনি প্রতিনিয়ত ঐকান্তিক। ঐক্য ও গোষ্ঠীগত সম্প্রীতি বিস্তারে তার আজীবন শ্রম, ত্যাগ ও নিষ্ঠা মানবীয় মূল্যবোধের পরম প্রকাশ। তিনি মনে করেন সম্প্রীতি ছাড়া উন্নয়ন, উন্নয়ন ছাড়া সভ্যতা এবং আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়া স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা যায় না।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার অনাবিল সম্মান, শ্রদ্ধাময় ভালবাসা ও অবিচ্ছিন্ন সহানুভূতি মুক্তিযুদ্ধের পরও থেমে থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন। ওয়াদুদ ভূইয়ার পরিবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পাশে ছুটে এসেছিলেন। গৃহহীন মুক্তিযোদ্ধাকে দিয়েছিলেন গৃহ, বস্ত্রহীনে বস্ত্র, খাদ্যহীনে খাদ্য। চিকিৎসার জন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা দিনের পর দিন বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। অনেকে টাকার অভাবে সময়মত মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না। ওয়াদুদ ভূইয়া ও তার পরিবার নিজ তহবিল হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের সকল অভাব পূরণ করেছিলেন। সে সময় ভূইয়া পরিবার খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেণী, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হতে আগত অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের হারানো মনোবলকে চাঙ্গা করে তুলেছিলেন।

কর্মস্থলে তিনি অমায়িক বাৎসল্যে পরিশুদ্ধ একজন দীক্ষাগুরু, আলোক বর্তিকা। তার কথা, আচরণ, ব্যবহার এবং মননশীলতা এতই চমৎকার যে, তার সংস্পর্শে এলে সবাই সহজে অভিভূত হয়ে যায়। তার অমায়িকতা বদলে দেয় ব্যক্তিকে, গড়ে তুলে নতুন ভাবনার উদ্যোমী প্রেরণা। তিনি বলেন কম, প্রকাশ করেন অধিক। শোনেন বেশি শুনান কম। আইন-কানুন, বিধি-বিধান, রাষ্ট্র ও প্রশাসন সম্পর্কিত খুঁটিনাটি বিষয়ে তার সম্যক জ্ঞান রয়েছে। যা প্রয়োজন হতে পারে তা তিনি পূর্বাহ্নে হৃদয়ঙ্গম করে আলোচনায় আসেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাবার আগে প্রয়োজনীয় সকল অস্ত্র নিয়ে তারপর নামেন। জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। তাই বলে পরাজয়কে বিনা প্রতিরোধে মেনে নেয়ার পাত্র তিনি নন। পরাজয় তাঁকে আহত করে না, বরং নব-প্রত্যয়ে দীপ্ত করে, উদ্বেলিত করে তুলে নবজয়ের স্বপ্নীল প্রত্যাশায়। তার রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রত্যন্ত রামগড় হতে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়ে মনোবল, উদ্যোম, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা আর সাহসিকতার বলে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এ উদাহরণ তাকে প্রতিনিয়ত উজ্জ্বীবিত রাখে। তার যে ভুল নেই তা নয়, কেউ ভুলের উর্ধ্বে নন। তবে ভুলকে তিনি অভিজ্ঞতার প্রসূতি মনে করেন। ভুল হতে শিক্ষা নিয়ে ভুলের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন অবলীলায়।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্নেহ এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রেরণার অনাবিল সান্নিধ্য ওয়াদুদ ভূইয়ার অনুপ্রেরণা। জিয়া তাঁর আদর্শ, খালেদা জিয়া রাজনীতিক অনুধ্যান এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাপ্নিক রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান তাঁর আদর্শিক অভিভাবক। জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত ও খালেদা জিয়ার স্নেহধন্য ওয়াদুদ ভূইয়া জাতীয়তাবাদী দলকে নিজের জীবনের চেয়েও পরম মমতায় লালন করেন। সেই শিশুকাল থেকে জিয়া তার অন্তরে আদর্শের, দেশপ্রেমের ও মননশীলতার যে বীজ বুনে গেছেন তা পুরো পৃথিবীর বিনিময়েও পরিবর্তন করা যাবে না। ওয়ান-ইলিভেনের পর বিএনপিকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য তাঁর ভূমিকা ও বুদ্ধিমত্তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জরুরি সরকারের নীলনক্সায় অংশ না নেয়ায় তাঁকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। সে সময় তার উপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তা মনে করতে শরীর শিউরে উঠে। আলাপ করতে গিয়ে আবেগে চোখ বুজে ফেলতে বাধ্য হন। জরুরি সরকার তার পড়নের লুঙ্গি পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছেন। তবু তিনি মাথা নত করেননি। এমন সাহসিকতায় ওয়াদুদ ভূইয়ার পাথেয়, জীবনের সম্বল। এমন কয়জন পারে বলুন!!! তাঁর দৃঢ় উক্তি, জীবন দেবো, তবু দেশনেত্রীর প্রতি আনুগত্য হতে এক চুল নড়বো না। বিএনপির দুঃসময়ে তিনি দলের জন্য আর্থিক ও মানসিকভাবে প্রচুর কাজ করেছেন। নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার নিমিত্ত তার নিরলস শ্রম ও ব্যয় চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এখনও তিনি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পুরো ১৮ ঘণ্টা বিএনপির মঙ্গলে, কল্যাণে নিবেদিত করেন। এটি যারা তাকে নিকট থেকে দেখেছেন তারা কোনভাবে অস্বীকার করতে পারবেন না।





ওয়াদুদ ভূইয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকাকালীন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘মার্জিত ভাষা ও সুললিত কণ্ঠের অধিকারী জনাব ভূইয়া দর্শনে যেমন মুগ্ধকর উপস্থাপনায় তেমনি অনাবিল, আচরণেও মধুময়। প্রতিটি বাক্য অকাট্য যুক্তির নির্যাস; স্পষ্ট এবং অর্থবহুল। অপ্রয়োজনীয় কথা বলাকে তিনি অহেতুক বুলেট ছোড়ার সামিল মনে করেন। যথাযোগ্য ব্যক্তিকে যথামর্যাদা প্রদান করতে পারেন। তবে এত সহজ সরল যে, সবাইকে বিশ্বাস করে বসেন। অনেক সময় এটি তার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওয়াদুদ ভূইয়া সম্পর্কে প্রাক্তন এক সচিবের সঙ্গে আলাপ করি। তিনি জানান, আমার মনে হয়েছে, তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি জনগণের কল্যাণে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত একজন সাধারণ মানুষ। জনগণ এমন একজন সহজ মানের অসাধারণ রাজনীতিবিদকে তাদের নেতা হিসেবে চান। এমন নেতাই দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে স্বপ্নীল আগামীর ভাবনায়। অনেক রাজনীতিবিদ মনে করেন ক্ষমতায় যেতে হলে সন্ত্রাসীদের সহায়তা প্রয়োজন। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন হীন মানসিকতায় মোটেও বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসীরা পক্ষান্তরে দলকে জনবিমুখ করে তোলে। জনগণের কাছে যেতে হলে জনগণের শত্রু সন্ত্রাস আর সন্ত্রাসীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে থাকার সময় তাকে খুব কাজ থেকে দেখেছি। মনে হয়েছে একটা শিশু। এমন নিষ্পাপ খুব কম লোকের মধ্যে আছে। পার্বত্যবাসীর প্রতি তার আজন্ম দরদ ভ্রাতৃত্ববোধকেও হার মানায়। আমি তাকে বয়সে ছেলের সমান হলেও শ্রদ্ধা করি। নিরহঙ্কারী ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা ওয়াদুদ ভূইয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে সবার নজরে নমস্য বিমূর্ততায় অভির্ভূত। তিল তিল পরিশ্রমে তিনি নিজেকে শুন্য থেকে এ অবস্থানে উপনীত করেছেন। তবু তিনি লালসাহীন, নির্লোভ। যার লোভ নেই, তিনি সবার কাছে লোভনীয়, আকর্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে শুরু করে পিয়ন, গ্রামে ধনী হতে শুরু করে ভিক্ষুক সবার প্রতি সমভাবুলতা তার বিশাল বৈশাল্যেও মহানুভবতার পরিচায়ক।



ওয়াদুদ ভূইয়া আপাদমস্তক পরিচ্ছন্ন। অনুপম শৈলিকলার সহনশীল সমসত্তায় নিগূঢ় তাঁর রাজনীতিক কর্মকান্ড এবং জনসংযোগ। তবে তিনি কিছুটা লাজুক; নিভৃতচারী ও প্রচার-বিমুখ। কর্মে তিনি এত বিশ্বাসী যে, প্রচার নামক বিষয়টি তার জীবনে তেমন দাগ ফেলতে পারে না। এটি কিন্তু বর্তমান রাজনীতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য আমি মনে করি যৌক্তিক না। বলা হয়, প্রচারই প্রসার। তিনি মনে করেন, ‘প্রচার নয়, কাজই আমার প্রধান লক্ষ্য। প্রচার দিয়ে কী হবে?' কাঠ নিজে পোড়ে অন্যকে আলো দেয়, ফুল-ফল ও সবুজের সম্ভার মাটির অবদান। কিন্তু মাটির খবর কেউ রাখে না। ঠিক তেমনি ওয়াদুদ ভূইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অধিবাসীর কল্যাণে যা করেছেন এবং করেন তা অতুলনীয়। অনেক কিছু করেও তিনি নিজেকে সাধারণ ভাবেন। শিক্ষা, উন্নয়ন, সংগঠন, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, পরিবেশ, প্রশাসন ইত্যাদিসহ আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি যেখানে যান সেখানে একটি পরম আবহ সৃষ্টি করার সামর্থ্য রাখেন। সৃষ্টি করেন অনুকূল পরিবেশ। অনেকে অন্যকে কথা বলতে দেন না, শুধু নিজেই বলে যান। ওয়াদুদ ভূইয়া কিন্তু অন্য রকম। তিনি সবার কথা শুনেন, সবাইকে গুরুত্ব দেন। পরে যা প্রয়োজন এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ শুনতে চান তাই বলেন। মানুষের মন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় অনুপম। কারও কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না। তাই তিনি অসাধারণ হয়েও সাধারণ, সাধারণ হয়েও অসাধারণ। ‘বাতাস ছাড়া মানুষ এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না। কিন্তু বাতাস আছে বলে আমরা তাঁর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারি না। বাতাস না থাকলে বোঝা যেত, বাতাস কত অনিবার্য। ঠিক তেমনি ওয়াদুদ ভূইয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কত অনিবার্য, কত প্রয়োজনীয় এটি সেদিনই অনুধাবন করা যাবে যেদিন তিনি থাকবেন না। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, সারা বাংলাদেশে ওয়াদুদ ভূইয়া একটি পরিচিত মুখ, পরিচিত নাম। পার্বত্য এলাকার শিক্ষা বিস্তারে শিশুবেলা থাকে তার অনবদ্য ভূমিকা সর্বমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। শিক্ষার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন তাঁর অনুধ্যায়ী চেতনার উত্তম প্রকাশ।


অনেকে রাজনীতি করেন ক্ষমতার জন্য, ভোগের জন্য। ওয়াদুদ ভূইয়া রাজনীতি করেন ত্যাগের জন্য, উন্নয়নের জন্য। রাজনীতিতে আসার পর তিনি রাজনীতি হতে এক পয়সাও লাভবান হননি বরং তাঁর আগমন পার্বত্যবাসীর রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে, পরিশুদ্ধ করেছে। পরের ধনে পোদ্দারি কি রাজনীতি? আমাদের দেশে রাজনীতি মানে পরের ধনে পোদ্দারি, ছোট ছোট জনগণের বিন্দু বিন্দু ক্ষমতা জড়ো করে অধিকাংশ রাজনীতিক জনগণের উপর পোদ্দারি করেন। অহমিকায় অন্ধ হয়ে যান। ক্ষমতার তোড়ে মানুষকে মানুষ মনে করেন না। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি জনগণের ক্ষমতা জনগণকে বিলিয়ে দিয়ে পুরো নিঃস্ব হবার প্রত্যয়ে দৃপ্ত। নিপাট অধ্যবসায়, প্রগাঢ় মনোনিবেশপ্রসূত অভিজ্ঞান ও কৃতজ্ঞতার তিলোত্তম মহিমায় বিভূষিত এবং বিরল অন্তর্দৃষ্টি ও যৌক্তিক মিথষ্ক্রিয়ার মাঝে সত্য-মিথ্যা ও বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এক প্রবল ক্ষমতা রয়েছে তার। তাই তিনি পরিপূর্ণ রাজনীতিক, আদর্শ নেতা এবং অনুসরণীয় একজন ব্যক্তিত্ব। যার উপর নির্ভর করা যায় সম্পূর্ণ। তিনি রাজনীতিবিদ, তবে গতানুগতিক নন। তিনি যুক্তিতে অমিয়, বস্তুনিষ্ঠতায় অনুপম। পার্বত্য এলাকায় তিনি সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। রাজনীতির মাঠেও প্রতিন্দ্বীর গলা জড়িয়ে ধরতে পারেন পরম ভালোবাসায়, নিবিড় শ্রদ্ধায়। উন্নয়নই তার লক্ষ্য, গ্রহণমুগ্ধতা তার দর্শন, জীবনবোধ তার আদর্শ। জনকল্যাণ ছাড়া তিনি রাজনীতিতে আর কিছু আছে বলে মনে করেন না। তার মতে, রাজনীতি শুধু দেয়ার জন্য, নেয়ার জন্য নয়। এমন মননশীল চেতনার অধিকারী বলে, পার্বত্যবাসীগণ তাঁর প্রতি অনুরূপ অনুরক্ত। অধিকাংশ পার্বত্যবাসী ওয়াদুদ ভূইয়া ছাড়া আর কিছু বোঝেন না।

ওয়াদুদ ভূইয়া শুধু রাজনীতিক নন, নেতাও বটে। তথাকথিত নেতা নন, নেতার সকল প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক উপাদানে পরিপূর্ণভাবে বিদুষিত একজন জনমন নন্দিত নেতা। একজন নেতার যে সকল গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নেতার যে সকল গুণাবলীকে অনিবার্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তার অধিকাংশই ওয়াদুদ ভূইয়ার রয়েছে। তিনি কৃতজ্ঞতায় আকাশ, তাঁর জন্য যারা এক পা নামেন তিনি তাদের জন্য দশ পা নামতেও দ্বিধা করেন না। যাদের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত তাদের জন্য রিক্ত হতে প্রস্তুত। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তাঁর অনাবিল চরিত্রের নিখাদ অলঙ্কার। তিনি মনে করেন, কৃতজ্ঞতাই প্রকৃত সম্পদ এবং অভিযোগ হচ্ছে দারিদ্র্য। তাই কারও প্রতি অভিযোগ নয়, ভালবাসা। কেউ তার প্রতি বিরক্ত হলে তিনি কৃতজ্ঞতায় সিক্ত হয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন।

ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ধারণা, অভিব্যক্তি ও বিশ্বাস যেমন উদার তেমনি প্রজ্ঞাময়। তিনি মুসলমান, তিনি বাঙ্গালি, তিনি জাতীয়তাবাদী; সর্বোপরি তিনি পার্বত্যবাসী সবার মনে লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর একজন উদার মনের সহনশীল মানুষ। মুসলমান হলেও তার প্রিয় নবী মুহাম্মদে (সাঃ) এর মত পরমতসহিষ্ণু। পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেকে মুসলমানকে যেমন ভালবাসেন তেমনি ভালবাসেন হিন্দু, বৌদ্ধসহ অন্য সকল ধর্মাবলম্বীদের। তাঁর শরীরে মোঘল রক্ত। তবে তিনি অসাম্প্রদায়িক। তার পরিষ্কার উক্তি, ‘হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টা তার সৃষ্টিকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছেন। তাই কারও প্রতি অসম্মান, অশ্রদ্ধা পক্ষান্তরে স্রষ্টাকে অপমান করার সামিল। এমন হীন কাজ আমি জীবন গেলেও করতে পারব না। মানবতার চেয়ে বড় ধর্ম আর নেই। আমি মানবতায় বিশ্বাসী। বস্তুত: চিন্তা, চেতনা ও কাজ-কর্ম এবং রাজনীতিতে আমি একজন মানবতাবাদী ও সর্বজনের হিতাকাঙ্খী ব্যক্তি। ছোট বেলা থেকে আমি সেভাবে বেড়ে উঠেছি, সে শিক্ষাই পরিবার থেকে পেয়েছি। ছোট বেলায় আমি বাংলা, আরবি ও উর্দু-ফারসির সাথে চাকমা ভাষাও রপ্ত করেছি। আমার যেমন মুসলমান বন্ধু আছে তেমনি আছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জাতিধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই আমার প্রিয় আপন জন। সবাইকে আমি ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। আমি আমার বেড়ে উঠার জন্য তাদের সবার কাছে ঋণী।’ তিনি আরও বলেন, মনুষ্যত্বের পরিচয়েই আমি মানুষকে বিচার করে থাকি। এখানে জাতি-ধর্ম, উপজাতি কিংবা অ-উপজাতি মুখ্য বিষয় নয়। আমার কাছে সবসময় মানুষই বড়। আমার ব্যবহারিক জীবনেও এ আদর্শই আমি সবসময়েই লালন করে আসছি এবং করব। আমি একটি অসাম্প্রদায়িক খাঁটি বাঙালি পরিবারে উপজাতি ও অ-উপজাতি পরিবেষ্টিত পার্বত্য উপত্যাকায় মানুষ হয়েছি। তাই আমার চেতনায় পার্বত্য এলাকার সকল জাতিগোষ্ঠী সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত পরম শ্রদ্ধার মানুষ। কাউকে আমি কোনদিন কোন অবস্থায় অবহেলা করব না। এমন শিক্ষাই আমার রক্তে বাহিত।



ওয়াদুদ ভূইয়া সাহসী। একজন জননেতার যেরূপ সাহস প্রয়োজন এবং সাহসকে যে কাজে ব্যবহার করা প্রয়োজন তেমনি করার সামর্থ্য রাখেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামের বাঙ্গালীদের রেশন নিয়ে এক সময় ব্যাপক চাঁদাবাজি হত। হেলাল গং চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিত। নীরিহ সধারণ লোকের সরলতাম ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে হেলাল গং প্রায় ২৬ হাজার পরিবার থেকে কার্ড প্রতি ৫ কেজি করে খাদ্য শস্য আদায় করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেন। এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হতো স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স ডিভিশন থেকে। গুচ্ছগ্রামের রেশনও এ বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা হতো। হেলাল গং খোজ-খবর রাখতেন কখন রেশন বরাদ্ধ হচ্ছে। ডিও ইস্যুর সাথে সাথে হেলাল গং হুংকার দিতেন, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে গুচ্ছগ্রামের রেশন বরাদ্দ দেয়া না হলে খাগড়াছড়ি অচল করে দেওয়া হবে। আর রেশন আসার সাথে সাথে গুচ্ছগ্রামবাসীকে বোকা বানিয়ে রেশন এসেছে তার হুমকির কারণে এমন অজুহাত তুলে চাঁদাবাজি করতেন। কী নির্মমতা সাধারণ মানুষকে নিয়ে একজন মানুষ করতে পারে তা ভাবলে মানুষ হিসেবে লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না।

সে সময় হেলাল গংদের এমন হীন কাজে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। হেলাল বাহিনীর প্রচন্ড সন্ত্রাসীদের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকত। এমন অবস্থায় হেলালের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে যে লোকটি সাহসীকণ্ঠে জনকল্যাণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি ছিলেন ওয়াদুদ ভূইয়া। তরুন নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রতিরোধের মুখে গুচ্ছগ্রামবাসী রক্ষা পান চাঁদাবাজ হেলাল গং থেকে। পার্বত্যবাসী ওয়াদুদ ভূইয়ার সাহস, দেশপ্রেম আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের উজ্জীবন শিখায় আপ্লুত হয় উঠেন। এতদিন তাদের মনে নেতৃত্বহীনতার যে সংকট ছিল তার দূরীভূত হতে চলেছে। জনগণ প্রবল আবেগে তরুণ নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রত্যয় দীপ্ত সাহসে নিবেদিত কল্যাণময় কর্মকান্ডের সহযোদ্ধা হিসেবে এগিয়ে আসেন। পার্বত্যবাসী খুঁজে পান তাদের নেতা। যার প্রাণে সাহসের অণল, হৃদয়ে ভালবাসার দহন।

ভূইয়া পরিবারের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। সে ঐতিহ্যে লালিত ওয়াদুদ ভূইয়া জন্ম থেকে প্রতিবাদী। প্রতিবাদী যে কোন অন্যায়, অবিচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। উপরে বর্ণিত হেলাল গং-এর ঘটনা ছাড়া এরূপ আরও অনেক ঘটনার কথা বলা যায়। তিনি রাজনীতিক জীবনের সূচনালগ্ন থেকে অনিয়ম ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিবাদের অজয় হিমালয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ লক্ষাধিক ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানের অনিয়ম-দূর্নীতির প্রতিবাদ স্বরূপ পদত্যাগ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হলেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেন সেখানে ওয়াদুদ ভূইয়ার মত একজন তরুন নেতার এমন সাহসী ও নির্লোভ ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনুসরণীয় ও বিরল ঘটনা বৈকি।

পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার ওয়াদুদ ভূইয়ার অবদান চিরস্মরণীয়। যখন সুযোগ পেয়েছেন শিক্ষা বিস্তারে উদার হস্তে এগিয়ে এসেছেন। শিশুবেলায় অসহায় ও দরিদ্র সতীর্থদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার মনোভাবের পরিচয় পাঠক ইতোমধ্যে পেয়েছেন। ওয়াদুদ ভূইয়া ছাত্র জীবন থেকে সৃষ্টি ও সেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত। আশির দশকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রামগড় সফরে আসেন। এ সময় কিশোর ওয়াদুদ ভূইয়া তার বিশাল সতীর্থ বাহিনী নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। প্রেসিডেন্ট তাদের দাবি কী জানতে চাইলে ওয়াদুদ ভূইয়া সবিস্তার যুক্তিসহ রামগড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার আবেদন করেন। ওয়াদুদ ভূইয়ার অকাট্য যুক্তি আর হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে বিমুগ্ধ প্রেসিডেন্ট রামগড় কলেজ স্থাপনের ঘোষনা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করার জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ঘটনা এখনও সবার মুখে মুখে ফোটে। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে ১৩ মে খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। এ সময় ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিকট থেকে রামগড় কলেজকে জাতীয়করণের ঘোষণাও আদায় করে নেন। শুধু রামগড় কলেজ নয়, ওয়াদুদ ভূইয়ার হাতে গত তিন দশকে শত শত কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, কেয়াং গড়ে উঠেছে। যা এখন পুরো খাগড়াছড়ি জেলায় কালের স্বাক্ষী হিসেবে দাড়িয়ে আছে। এবং আমুল বদলে দিয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার মান। মূলত তার হাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সত্যিকার প্রসারের মহান অনুভবের আলেখ্য প্রতিষ্ঠা পায়। শিক্ষক সমাজকেও তিনি সবসময়েই শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন। উপমন্ত্রী পদমর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন তিনি তাঁর শিক্ষক দেখলে গভীর আবেগ পরম শ্রদ্ধা জানাতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন না।

ওয়াদুদ ভূইয়া সহানুভূতির বরপুত্র, ভালবাসার নিয়ামক। মানুষের দুঃখে সকল বিপদ তুচ্ছ করে এগিয়ে যাবার যে মানসিকতা পার্বত্য অঞ্চলে তা আর কোন নেতার মধ্যে আছে কিনা আমার জানা নেই। খাগড়াছড়ি জেলার সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি রক্ষায় ওয়াদুদ ভূইয়ার অবদান এ অঞ্চলের মানুষ চিরদিন স্বরণে রাখবে। আশির দশক থেকে শান্তিবাহিনী হাজার হাজার লোককে খুন করেছে, গুম করেছে; আহত করেছে। আগুন দিয়েছে লোকালয়ে। যেখানে মানুষের বিপদের সংবাদ পেয়েছে সেখানে নিজের জীবন ভয়কে তুচ্ছ করে দৌঁড়ে গিয়েছেন। তিনি নিজে লাশ টেনেছেন, দাফন করেছেন, সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। আবার সাধারণ পাহাড়িরা যাতে হামলার শিকার না হন তার জন্য তার কর্মী বাহিনী দিয়ে রাত-দিন পাহারা দিয়েছেন। যারা তার কর্মীবাহিনীকে হত্যা করেছে, অত্যাচার করেছে তাদের উপর এমন সহানুভূতি মহামানবের প্রতিবিম্ব ছাড়া কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।

সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা অধিকাংশ রাজনীতিবিদের স্বাভাবিক চরিত্র। ওয়াদুদ ভূইয়া কখনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। বরং সিদ্ধান্তই তাকে বাস্তবতার বিমূর্ত বিকেলের মতো নন্দিত করে তোলে। তাই তাঁর সিন্ধান্তগুলো সব সময় যথার্থ ও নান্দনিক হয়ে ওঠে। যুক্তি, গ্রহণ মানসিকতা, ঔদার্যময় প্রেরণা ও যথামূল্যায়নের কার্যকর দক্ষতা তাঁকে সংকট মোকাবেলায় মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ওয়াদুদ ভূইয়ার আচরণ কিংবা ব্যবহারে প্রতিপক্ষ কখনও আহত হন না। তিনি কাউকে কষ্ট দিয়ে কোনো কথা বলেন না। তবে যা সত্য তা বলতেও দ্বিধা করেন না। সংসদে, মাঠে, রাজনীতিক মঞ্চে, অফিসে, সবখানে তিনি অমায়িক, মার্জিত। কেউ তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও তিনি অকারণে ক্ষুব্ধ হন না। অনেক সময় অনেকে তাঁর প্রতি রাগ দেখালেও তিনি থাকেন সাবলীল, সহাস্য। এরূপ হাসি দিয়ে তিনি কত রাগান্বিত লোকের হৃত স্বাভাবিকতা জাগ্রত করে কলহাস্যে মেতে উঠেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কৃতজ্ঞতা তাঁর চরিত্রের আর একটি বিশেষ গুণ। কেউ তাঁর সামান্য উপকার করলে তিনি তা কথা, কাজ আর নিষ্ঠা দিয়ে অসংখ্যভাবে ফেরত দেয়ার চেষ্টা করেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে তিনি এত সচেতন এবং এত নিষ্ঠাবান যে, কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সকল পথ অবারিত হয়ে যায়। তিনি যা বলেন মেপে, যা করেন ভেবে। প্রত্যেকটি কাজ নিবিড় পর্যক্ষেণ ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পন্ন করেন। তিনি বিনয়ী, ভদ্র ও মার্জিত। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হয় কোমল; প্রকৃতপক্ষে আপোষহীন চেতনায় অনড় একটি ভীষণ হিমালয়; যদি সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যত্যয় ঘটে। তাঁর জীবনের অনেক ঘটনা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

বন্ধু হিসেবে ওয়াদু ভূইয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবলোকন করলে সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে যায়- ফ্রেন্ড ইজ বর্ন, নট মেইড। প্রকৃতি মানুষকে সেরা জীবন উপভোগের জন্য যে সকল সম্পদ ও ঐশ্বর্য্য দিয়েছেন তন্মধ্যে বন্ধুই সর্বশ্রেষ্ঠ। ওয়াদুদ ভূইয়ার সাথে বন্ধুত্ব হলে প্রথম এটিই মনে পড়ে। তার বন্ধুত্বে কোন খাদ নেই, নিখাদ। তিনি মনে করেন বন্ধু হবার একমাত্র উপায় অভিন্ন হয়ে যাওয়া। তিনি এটি পারেন। তাই ভার্জিনিয়া উলফ এর ভাষায় নির্ধিদ্বায় বলে দিতে পারেন: Some people go to priests, others to poetry; I to my friend. সাধারণত কেউ বিপদে পড়লে শুভাকাঙ্খী এগিয়ে এসে প্রয়োজনের কথা জানতে চান; জানতে চান কী প্রয়োজন, কতটুক প্রয়োজন। কেউ বিপদে পড়লে ওয়াদুদ ভূইয়াকে এমন প্রশ্ন করতে দেখিনি। তিনি নিজে গিয়ে যা প্রয়োজন তা করে দিয়ে যান স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমের আকণ্ঠ মুগ্ধতায়। বন্ধু বিপদে পড়লে কী প্রয়োজন, কতটুক প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন এটি যে অনুধাবন করতে পারে না সে আবার কীসের বন্ধু!



ওয়াদুদ ভূইয়া একজন কুশলী মানুষ। সুন্দর মন বিরজিত অপলক দৃষ্টি তার ব্যক্তি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিশোর বয়স থেকে ক্ষমতায়, ঐশ্বর্য্যে বড় হয়েছেন। এ বয়সে অর্থ, ক্ষমতা ও এমন ঐশ্বর্য্য অনেকের মধ্যে অনেক বদ অভ্যাসের অবতারণা ঘটায়। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া এমনভাবে গড়ে উঠেছেন যে, কোন অবস্থাতে কোন বদঅভ্যাস, সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা এতই প্রবল যে, কোন প্রলোভন তাকে ঢলাতে পারেনি একবিন্দু। শুধু কর্মে নয়, আচরণেও তার চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনভাবে তিনি বলেন, যাতে কেউ কষ্ট না-পায়, এমনভাবে দেখেন যাতে কারও মনে লজ্জা, দুঃখ বা ভীতির সঞ্চার না হয়। কারও সমালোচনা করার সময়ও শালীনতাবোধ বজায় রাখেন। তিনি তর্কে যৌক্তিক, চেতনায় উদার। কথার মাঝে তাখে দার্শনিক নন্দনযুক্ত শালীন রসবোধ, আগ্রহের প্রতিবিম্ব। আরও শুনার ইচ্ছা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। একবার কোন কিছু শুনলে সহজে ভুলেন না। এ গুণটা অনেক বড় বড় নেতার মত ওয়াদুদ ভূইয়াতেও পূর্ণমাত্রায় দেখা যায়। তার কথায় প্রেরিত আহবান যৌক্তিক আর মনোরম। যা কথাকে উপভোগ্য এবং হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। রাগ মানুষের আজন্ম স্বভাব। তবে তার রাগ সাধারণ মানুষের মত নয়। রাগ সম্পর্কে তাঁর একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেটি হল- Anybody can become angry, that is easy; but to be angry with the right person, and to the right degree, and at the right time, and for the right purpose, and in the right way, that is not within everybody’s power that is not easy. তিনি বলেন, এতগুলো বিষয়কে সমন্বয় করে রাগ করা পৃথিবীর খুব কম মানুষের পক্ষে সম্ভব। তাঁর চাইতে নিজের রাগকে গোপন রেখে মানুষের প্রতি উদার মনোভাবে এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে উত্তম। তার প্রতি অনেকে দুর্ব্যবহার করেছে, মিথ্যা মামলায় হয়রানি করেছে। তিনি যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, ইচ্ছা করলে তাদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু নেননি, ক্ষমা করে দিয়েছেন। চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দেয়ার মত অসাধারণ ক্ষমতা তার রয়েছে।

ওয়াদুদ ভূইয়ার মত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অনবদ্য এক নেতার অবয়ব রচনা দূরে থাক, কর্মচাঞ্চল্যের একটি মুহূর্তের প্রকাশও এ স্বল্প পরিসরে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একদিন একটা কথার জবাব দিতে গিয়ে বলেছিলেন, আমি নিজে একজন মানুষ, অতি ক্ষুদ্র; যেমন আমার চার পাশে যারা আছে তাদের একজনের মত। তবে আমার মধ্যে যদি আলাদা কিছু থাকে তা হচ্ছে আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণের সম্মিলিত রূপ- তাদের আশা-আকাঙ্খা। দূর হতে দেখতে দেখতে কোন্ সময় কখন কীভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছি জানি না। এটি অনেকে গভীর আবেগে হারিয়ে যাবার মত অবস্থা। বুঝতে পারলাম : অমন সুদৃশ্য বিশালতায় হারিয়ে যাবার কষ্ট কত আনন্দের। ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রত্যয়ী পরিভাষার কোমল লাস্যে প্রেমের সাথে মধুময় জীবনের প্রত্যাশা বৃষ্টির মতো শ্যামল করেছে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্যবাসীর জনগণমনের চেতনা ও রাজনীতির জটিল ক্ষেত্র। রাজনীতিক সন্ত্রাস, সংকীর্ণ স্বার্থ, হানাহানি, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ওয়াদুদ ভূইয়ার অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিশীলিত করার একটি মহৎ উদ্যোগ। তিনি তাঁর সংসদীয় এলাকার রাজনীতিকে কলুষমুক্ত ও জনকল্যাণমূখী করার চেষ্টায় সতত নিবেদিত। এলাকায় তিনি দল-মত নির্বিশেষে অভিন্ন হৃদ্যে একাকার। তিনি ব্যবহারে বিনয়ী, কর্মে নিষ্ঠ, সিদ্ধান্তে বলিষ্ঠ, আচরণে শিষ্ট, বিচক্ষণতায় ঋদ্ধ, ব্যবস্থাপনায় মার্জিত এবং কৃতজ্ঞতায় অনুপম। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে যারা প্রকৃতির মত নির্ঝর। যারা প্রত্যয়ের আলোর সাথে হাসে, ন্যায়-নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠায় দুপুরের কড়া রোদের মত তপ্ত, সেবায় রূপোলি বিকেলের মত আকর্ষণীয়, স্নেহে জ্যোস্নার মত মায়াময়। যারা বৃষ্টির সাথে কাঁদে, নদীর সাথে গায় আবার ক্ষণে ক্ষণে জীবনের চৈতালী সাজায় নিজেকে উজাড় করে দিয়ে অন্যের জন্য। ওয়াদুদ ভূইয়া এমন অনাবিল চরিত্রের অধিকারী একজন বিরল মানুষ।

ভিনস্ লেম্বর্ডির একটা উক্তি আছে। তিনি বলেছেন, The man on top of the mountain didn't fall there.. পাহাড়ের চূড়োয় কেউ উপর থেকে হঠাৎ এসে পড়ে না। পাহাড়ের চূড়োয় উঠতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন শ্রম, মেধা আর চেষ্টা। ওয়াদুদ ভূইয়া কঠোর শ্রম, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর আত্মত্যাগের বদৌলতে তিল তিল সাধনায় আজকের স্থানে পৌঁছেছেন। এ আরোহণে তিনি কারও সাহায্যের অপেক্ষায় থাকেননি। নিষ্ঠা, শ্রম, মেধা আর একাগ্রতার মাধ্যমে জয় করেছেন সর্বোচ্চ শৃঙ্ক। খাগড়ছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। খাগড়াছড়ির জনগণ তাঁকে কত ভালোবাসে, তিনিও খাগড়াছড়ির জনগণনে ভালবাসেন। নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি ওয়াদুদ ভূইয়ার আলাদা দরদ রয়েছে। যেমন থাকে পরিবারের প্রতি। খাগড়াছড়ি তার নির্বাচনী এলাকা। তিনি নির্বাচনী এলাকার জনগণকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো মূল্যায়ন করে থাকেন। তিনি তাদের সুখ-দুঃখ ও হাসি-বেদনার সার্বক্ষণিক সাথী। জনগণের প্রতি ওয়াদুদ ভূইয়ার সহমর্মিতা যেমন হৃদয়গ্রাহী তেমিন আবেগময় ভালবাসায় অভিষিক্ত।

খাগড়াছড়ি ওয়াদুদ ভূইয়াকে বেশি দিয়েছে নাকি নাকি ওয়াদুদ ভূইয়া খাগড়াছড়িকে বেশি দিয়েছে? এসব নিয়ে তার ভাবার অবকাশ নেই। তিনি ভাবেন না। তিনি শুধু জানেন মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। সুন্দরের মহিমা, প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ লক্ষ সমস্যায় জর্জরিত, অর্ন্তদ্বন্দ্বে রক্তাক্ত। একে বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে যে কোন মূল্যে।

ক্রমশ:

 



আমার চোখে ওয়াদুদ ভূইয়া

মোজাম্মেল হোসেন বাবলু

ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ:

ছাত্রজীবন থেকে ওয়াদুদ ভুইয়া সংস্কৃতিমনা ও নির্মল বিনোদন প্রেয়সী। স্কুল জীবনে চুটিয়ে ফুটবল ও ক্রিকেট ভালবাসতেন। ভাল খেলোয়াড় হিসাবেও এলাকায় পরিচিতি ছিল। শুধু তাই নয়, খেলাধুলার উন্নয়নে সাধ্যমত চেষ্টা করতেন। রামগড় ক্রীড়া সংস্থার সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। রামগড়সহ খাগড়াছড়ি এলাকার বিভিন্ন ক্রীড়াসংগঠনের একনিষ্ঠ পৃষ্টপোষক হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তার আন্তরিকতার অভাব ছিলনা। রামগড়ে “পেনোরমা শিল্পীগোষ্ঠী” নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, “উদয়ন ক্লাব” নামেও একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এখানে অভিনয় করতেন এবং অভিনয়ে নির্দেশনা প্রদান করতেন।



শিক্ষানুরাগী প্রসঙ্গ

১। রামগড়ে “শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের কিন্ডার গার্টেন স্কুল” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা বর্তমানে একটি সনামধন্য স্কুল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ওয়াদুদ ঐ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাহায্য করতেন। জিয়া খালপাড় জুনিয়র হাই স্কুল, অনাথ এতিম ফ্রি আবাসিক বিদ্যালয়, জিয়া পিলাক জুনিয়র হাই স্কুল, মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা, তাইন্দং ওয়াদুদ ভূইয়া জুনিয়র হাই স্কুল, খাগড়াছড়ি সরকারী মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, খাগড়াছড়ি সদর গঞ্জপাড়ায় “ওয়াদুদ ভূইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়”, মহালছড়ি জয়সেন পাড়ায় “শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের জুনিয়র হাই স্কুল, চৌংরাছড়ি হাই স্কুল ও মানিকছড়িতে “বাশঁরী জুনিয়র হাইস্কুল”। এ ছাড়াও তিনি বহু প্রাইমারী স্কুল, জুনিয়র হাই স্কুল, হাই স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।এছাড়া তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে রামগড় সরকারী ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবী তোলেন এবং প্রেসিডেন্ট তা বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে তা সরকারীকরন করেন।

২। রামগড় ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ, খাগড়াছড়ি সরকারী মহিলা কলেজ, মহালছড়ি কলেজ, মানিকছড়ি গিরী মৈত্রী ডিগ্রি কলেজ, পানছড়ি বাজার স্কুল এন্ড কলেজ গুলোর পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন।

আধুনিকতায় ও রুচিশীলতায় ওয়াদুদ:

ওয়াদুদ অত্যন্ত সৌখিন এবং রুচিশীল মনের মানুষ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে “ট্রেডিশনাল” ধারাবাহিকতার বাহিরে কাজ করতে পছন্দ করতেন এবং বর্তমানেও করেন। পার্বত্য তিন জেলায় নান্দনিক, ব্যতিক্রমী প্রচুর শৈল্পিক স্থাপনা গড়েছেন। জণকল্যাণমূখী বহু অবকাঠামোগত আর্কিটেকচারাল ডিজাইনে স্থাপনা নির্মান করেছেন। তার ব্যাক্তিগত জীবনেও তার নিজস্ব অফিস, খাগড়াছড়ির বাড়ি ও গ্রামের বাড়ি নির্মানেও রুচিশীল, শৈল্পিক ও নান্দনিক ডিজাইনের স্বাক্ষর বহন করেন। যেমন তার গ্রামের বাড়িটির লোকজ সামগ্রী বাঁশ দিয়ে নির্মিত। যেন এক শৈল্পিক অনন্য সৃষ্ঠি একটি বাড়ি। বাড়িটি কানাডার এক স্থপতির হাতে ডিজাইন করা। যা দেখতে প্রতি দিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমায়। তার খাগড়াছড়ির বাড়িটিও যেন আধুনিক শিল্পকর্মের নান্দনিকতায় গড়া।

রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ:

রাজনীতিতে তার নির্দিষ্ঠ (সীমাবদ্ধ) কোন লক্ষ্য ছিলনা, লক্ষ্য ছিল অসীম। রাজনীতি করে তিনি যতটাই না এমপি মন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে ছিলেন তার চেয়েও মানবিকতায়, মানবিক মুল্যবোধে, মানুষের সেবায়, সমাজ উন্নয়নে, সমাজ বিবর্তনে, সৎ ও নিষ্ঠাবান সু-দক্ষ কর্মী বাহিনী সৃষ্টি ও সাংগঠনিক কাঠামোগত বির্নিমানে অধিক সচেতন ও যত্নবান । তিনি রাজনৈতিক জীবনে পুরদস্তর একজন নেতা হতে চেয়েছেন। শুধু মাত্র জন প্রতিনিধি নয়। যাকে ক্ষমতাবিহীন সময়ও মানুষ ভালবাসবে, কাছে আসবে এবং তৃপ্ত হবে এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই হতে চেয়েছেন এবং তিনি মনে করেন এক্ষেত্রে তিনি তাই হয়েছেন, সফল হয়েছেন। যা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ তার এ দু:সময়েও তার প্রতি অকৃত্তিম সমর্থন ও ভালবাসায় সিক্ত করেছেন, পূর্ণ করেছেন। ১/১১’র জরুরী অবৈধ সরকার তার প্রতি নির্মম নির্যাতন, হয়রানী ও প্রায় তিন বছর জেলে অন্যায় ভাবে আটক রাখা ও বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার তার প্রিয় ও তিলে তিলে ঘড়েতোলা নির্বাচনী এলাকায় তাকে থাকতে না দেওয়ার পরও সে নির্বাচনী এলাকা খাগড়াছড়ির পাহাড়ী বাঙ্গালী নির্বিশেষে আপামর জনতার অকুন্ঠ সমর্থন ও ভালবাসায় তিনি পরিপূর্ন। যা তিনি পেতে চেয়েছিলেন।

তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে চলমান সময় পর্যন্ত বহু উত্থান-পতন, জেল জুলুম হুলিয়া, হামলা- মামলা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে, বহু বন্দুর দূর্গম পথ অতিক্রম করে রাজনৈতিক জীবনের এ পরিক্রমায় এসে দাঁড়িয়েছেন। এক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাদ-আহ্লাদ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা উপেক্ষা করে পরিবারের সময়টুকুও কেড়ে নিয়ে, তুচ্ছ করে, রাজনীতি ও মানুষকে সময় দিয়েছেন।

সামাজিকতা:

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামাজিকতা রক্ষা করতেন ও দাওয়াত রক্ষা করতেন। বিনা দাওয়াতে ধর্মীয় যে কোন অনুষ্ঠানে নির্দ্বিধায় অংশ গ্রহন করতেন। বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, কেয়াং, গীর্জা, প্যাগোডা ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

অসাম্প্রদায়ীকতা:

সেই স্কুল জীবন থেকে তার মধ্যে অসাম্প্রদায়ীক মনোভাব লক্ষনীয় ছিল, যা বর্তমানেও আছে। যেমন, ভিন্ন ধর্মালম্বীদের বাড়িতে অপ্রতুল পরিবেশেও তিনি অংশ গ্রহন করতেন এবং খাবার খেতেন। যা একজন মুসলমান খেতে পারতেন না নির্দ্বিধায়।

** তিনি ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সদালাপী এবং বন্ধুবৎসল। বিনয়ী, পরোপকারী ও নির্যাতিতদের পাশে দাড়িয়ে নির্যাতনকারীদের কঠোর ভাবে ধাক্কা দিয়েছেন। এ জন্য তাকে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। কেউ ক্ষুধার্ত বললে খাইয়েছেন, বন্ধুদের ও সহ-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে খেতে ভালবাসেন। গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া লেখায় অর্থ জুগিয়েছেন। গরীব মানুষের ছেলে মেয়েদের বিয়েতে সাহায্য দিয়েছেন। যাতায়াতকারী বিপদগ্রস্থ পথিকের ভাড়ার অভাব শুনলে তা জুগিয়েছেন। দূর্ঘটনা কবলিত মানুষের চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছেন। গরীব রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা প্রদান করেছেন। নিজের কাছে না থাকলে সহ-কর্মী, বন্ধুদের বা সচ্ছল ব্যক্তিদের সহযোগীতা নিয়ে নিজ উদ্যোগি হয়ে উক্ত বিপদগ্রস্থদের পাশে দাড়িয়েছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় ১৯৮৬/৮৭’র কোন একদিন ওয়াদুদের কাছে খবর আসে রামগড়ের নাকাপা নামক স্থানে একটি ভয়াবহ বাস র্দুঘটনা ঘটে, বাসটি পাহাড়ের রাস্তা থেকে প্রায় ৫০০ ফুট নিচে পড়ে যায়। ওয়াদুদ তার রাজনৈতিক টিম নিয়ে দ্রুত গতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। দূর্ঘটনাস্থলের জায়গাটা ছিল অতন্ত দূর্গম ও বন্দুর। দূঘর্টনা কবলিত বাসের প্রায় সকল যাত্রীই ছিল বাসের ভিতরে ও বাসের নিচে চাপা পড়া। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের কোন রকম বের করে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। ওয়াদুদ ঘটনাস্থল থেকে বেশ দূরের একটি দরিদ্র গ্রামের গ্রামবাসীদের থেকে দা, কুড়াল, খন্তা, শাবাল ইত্যাদি সংগ্রহ করে ঘটনাস্থলে ফিরে সবাই মিলে উক্ত বাসটি কেটে কেটে আহত এবং নিহতদেরকে বের করে আনে সঙ্গীদের নিরলশ চেষ্টায়। এ দূঘটনায় ২২ জন যাত্রীর লাশ ও প্রায় ৪০ জন আহত যাত্রীকে উদ্ধার করে। নিহতদের ঠিকানা সংগ্রহ করে যার যার দূর-দূরান্তের বাড়ীতে লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করে এবং আহতদের রামগড় হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এবং চিকিৎসা পরবর্তীতে তাদের নিজ নিজ বাড়ীতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। উল্লেখ্য যে, এ দূঘর্টনা কবলিত প্রায় সকল যাত্রীরাই ছিল দরিদ্র এবং দূর দূরান্তের ভিন্ন জেলার যাত্রী। এই আহত নিহতদের উল্লেখিত সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল। কোনরুপ সরকারী সহযোগীতা ছাড়াই আমরা ওয়াদুদের নেতৃত্বে অর্থের যোগান দিয়েছিলাম। এখানেই শেষ নয় এরকম অসংখ্য দূঘর্টনা কবলিত ঘটনায় ওয়াদুদের নেতৃত্বে অনুরুপ ভূমিকা আমরা রেখেছিলাম। এসকল ঘটনায় ওয়াদুদ ধীরে ধীরে জন মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতে শুরু করে। এ জাতীয় মানবিক ঘটনার মধ্য দিয়েই ওয়াদুদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে।

দৃঢ় মনোবল:

ওয়াদুদ অত্যন্ত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। যেমন- ওয়াদুদ বিগত ১/১১’র সময় কারা জীবনে, তখনকার সরকারের ভয়, ভীতি এবং লোভ দেখানোর ফাঁদে পা দেননি। যার জন্য তাকে প্রায় ৩ বৎসর স্বাভাবিক জীবন খেকে বিচ্ছিন্ন জেল জীবন কাটাতে হয়েছিল এবং তখনকার সরকার তার সকল পৈতৃক ধন-সম্পদ, তার জীবনের অর্জিত সম্পদ সহ সকল ধন-সম্পত্তি অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত করেছিল। যে কারনে বর্তমানে সে অর্থনৈতিকভাবে চরম অভাব অনটনের মধ্যেও রাজনৈতিক এবং ব্যাক্তি জীবন অতিক্রম করে দৃড়তার সহিত এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ঘুরে দাড়িয়েছেন। অবশ্য সে এক্ষেত্রে র্নিদ্ধিধায় বলিষ্ঠ উচ্চারন করেন বিগত জীবনের সতীর্থ, রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও জনগনের সর্বাত্নক সমর্থন ও সহযোগীতায় ঘুরে দাড়িয়েছেন।

প্রতিবাদী হিসাবে:

১। ওয়াদুদ তখন নবম শ্রেনীর ছাত্র, স্কুলে আসা দূরের ছাত্রদের সাথে প্রায়শই বাস শ্রমিকরা দুর্ব্যাবহার, নির্যাতন ও অবহেলা করত। তখন স্কুল ছাত্রদের বাস ভাড়া ছিল অর্ধেক। ফলে বাস শ্রমিকদের কাছে যাত্রী হিসেবে স্কুল ছাত্ররা আকর্ষনীয় যাত্রী ছিলনা। একদিন স্কুল ছাত্রদেরকে স্কুল গেটে নামানোর সময় অমানবিক ভাবে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কিয়ে নামিয়ে দেয়। তাতে অনেক ছাত্র আহত হয়। আহত ছাত্ররা স্কুলে এসে ছাত্র এবং শিক্ষকদের ঘটনার বিবরন বর্ননা করলে ছাত্র শিক্ষকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, কিন্তু স্কুলের কিশোর ছাত্ররা ও নিরিহ শিক্ষকরা অসহায়ত্ব বোধ করে। ওয়াদুদ এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করে অনুধাবন করে যে, এখনি প্রতিবাদের সময়। যেমন চিন্তা তেমন কাজ! ওয়াদুদ স্কুলের সকল কিশোর ছাত্রদেরকে একত্রিত করে ছুটে যায় রামগড় বাস স্টেশনে এবং অভিযুক্ত বাস সহ কয়েকটি বাসের ড্রাইভারদেরকে বাধ্য করে স্কুল কমপাউন্ডে বাসগুলো নিয়ে আসে এবং বিচারের দাবীতে আটক করে এবং অনির্দিষ্ট কালের জন্য সড়ক অবরোধ করে। এ ঘটনায় ক্ষীপ্ত হয়ে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি কিশোর স্কুল ছাত্রদের মুখোমুখি দাড়ায় এবং স্থানীয় বিপদগামী রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে ও হস্তক্ষেপে ওয়াদুদকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করায়। অবশেষে ৭দিন পরে ওয়াদুদ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে স্কুলে ফিরে আসলে ক্ষুদে ছাত্রদের ও নিরিহ শিক্ষকদের ভালবাসায় ও ফুলে ফুলে অভিনন্দিত হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই ওয়াদুদের নেতৃত্বের সূচনা ঘটে।

২। তিনি রামগড় কলেজের ১ম বর্ষে পড়াকালীন সময় সিনেমা হলে ছাত্রদের উপর হল শ্রমিকদের নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ওয়াদুদ ভূইয়া নির্যাতিত ছাত্রদের পক্ষে হল মালিকদের বিরুদ্ধে কঠিন আন্দোলন গড়ে তুলেন এবং সকল সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে তত্কালীন রামগড়ের মহকুমা প্রশাসক গোলাম মর্তুজার হস্তক্ষেপে উক্ত ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা সিনেমা হল বিরোধী আন্দোলনের অবসান ঘটে। এভাবে ওয়াদুদ স্কুল ও কলেজ জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করে। এরকম হাজারও জনকল্যানমুখী কর্মকান্ডে ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রতিবাদী চরিত্র পার্বত্য বাসীর কাছে প্রসারিত হতে থাকে।

চরিত্র প্রসঙ্গ:

১। মদ, জুয়া ও নারী এগুলোকে প্রত্যাখান এবং বন্ধুদের প্রতিও এগুলোকে প্রত্যাখান করার আহবান করতেন। তিনি মনে করেন একজন রাজনৈতিক ব্যাক্তির এ জাতীয় বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কারন সাধারন মানুষ এ জাতীয় বিষয়ে আসক্ত রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দ, সমর্থন ও সম্মান করে না এবং এ জাতীয় রাজনৈতিক নেতারা তাদের দল, নেতাকর্মী ও জনগনকে সময় দিতে পারে না ও সমাজের কোন কাজে তারা আসে না। অর্থাৎ যে সকল রাজনৈতিক নেতা এ সকল কর্মকান্ডে আসক্ত থাকে তারা তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।

২। রাজনীতির কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মেয়েদের প্রেমে সাড়া দিতেনা না। কারন তিনি মনে করেন একজন রাজনৈতিক নেতা প্রেম বিষয়ক কাজে জড়িত হলে তার দল, নেতাকর্মী ও জনগনকে সময় দিতে পারবে না, অপরদিকে প্রেমিকাকেও যথাপযোক্ত সময় দিতে পারবেনা। এতে প্রেমিকা নিজেকে অবহেলিতবোধ করবে। প্রেম এবং রাজনীতি পাশাপাশি চললে রাজনীতি ও প্রেম উভয় দিক ক্ষতিগ্রস্থ হবে, যার কোনটাই পরিপূর্নতা লাভ করবে না। এতে একজন রাজনৈতিক ব্যাক্তির কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো বাধাগ্রস্থ হবে।

৩। অর্থের লোভ তার মধ্যে কখনোই দেখি নাই। এক রকম অর্থের প্রতি তার উদাসীনতা পরিলক্ষিত ছিল যা বর্তমানেও তার মধ্যে বিদ্যমান।

৪। সকাল বেলা বন্ধুদের সাথে হোটেলে নাস্তা করা এবং কত টাকা বিল হয়েছিল এ সমস্ত চিন্তা তার মধ্যে ছিলনা। কখনো কখনো দেখা যেত তার পকেটে এক টাকাও নাই, না থাকলেও কোন ছিন্তা ছিলনা। বন্ধু বান্ধব সহ সে অনায়াসে খেয়ে যেত। পরবর্তীতে বড় ভাই সাহাব উদ্দিন ভূইয়া সে বিল পরিশোধ করতো।

***১৯৮১ সালের ঘটনা ওয়াদুদ তখন রামগড় কলেজে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র, তার নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন কর্মীর ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে রামগড় মহকুমা শহরের সফি সওদাগরের সাথে ঝগড়া বাধে, এতে সফি সওদাগরের মাথা ফেটে যায়। এ নিয়ে বিনা কারনে ওয়াদুদকে দায়ী করে তৎকালীন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ (মোড়ল) দের যোগসাজশে ওয়াদুদ ভূইয়ার বিরুদ্ধে রামগড় শহরের দোকানপাট বন্ধ করে দেয় এবং ওয়াদুদকে রামগড়ে অবাঞ্চিত ঘোষনা করে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও তৎকালীন মোড়লদের সাথে ওয়াদুদের পক্ষের লোকদের মধ্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে মহকুমা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান কাজী রুহুল আমিনের নেতৃত্বে বিচার বসে। উল্লেখ্য কাজী রুহুল আমিন তখন রামগড় (মহকুমা) রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন এবং তিনি ওয়াদুদের বিপক্ষে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তিনি সে বিচারে ওয়াদুদকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে রামগড় মহকুমা ত্যাগ করার রায় ঘোষনা করেন। ওয়াদুদ এ রায় উপেক্ষা করলে পরের দিন ওয়াদুদকে বাধ্য করার জন্য চেয়ারম্যান কাজী রুহুল আমিনের লাঠিয়াল বাহিনী ওয়াদুদের উপর হামলা চালায়। এতে ওয়াদুদ অক্ষত থেকে পাল্টা আক্রমন করলে দু পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। এ ঘটনায় ওয়াদুদকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। দশ পনের দিন পর ওয়াদুদ জেল থেকে মুক্তি পেলে ওয়াদুদের পক্ষের লোকজনেরা ওয়াদুদকে পুষ্প মাল্য দিয়ে বিশাল বিক্ষোভ সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে। পরবর্তীতে ওয়াদুদ বহাল তবিয়তে নিজ এলাকায় নিজ বাড়ীতে বসবাস করতে থাকে এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হতে থাকে।

উল্লেখ্য কাজি রুহুল আমিনের সাথে ওয়াদুদের পূর্ব শত্রুতা ছিল। কারন ১৯৭৯ সালের কথা, ওয়াদুদ তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। কাজী রুহুল আমিন এলাকার চেয়ারম্যান, সরকার কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলের গরীব জনগনের জন্য প্রেরিত রিলিফের গম আত্মসাৎ করে তার নিজস্ব মিলে অবৈধ ভাবে আটা করে। সে চোরা কারবারী আটা ভোর রাত্রে চারটি বাস ভোজাই করে সমতল ভূমির উদ্দেশ্যে পাচার করছিলো। ওয়াদুদ ফুটবল অনুশীলনের জন্য ঘটনার দিন একা ভোর ৫ টায় ফুটবল মাঠে যাওয়ার পথে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে চোরা আটাই ভোজাই গাড়ী গুলো আটক করে। গাড়ীগুলোর কয়েকটি ড্রাইভার পালিয়ে যায়, দুজন ড্রাইভারকে ওয়াদুদ বেধে ফেলে এবং চোরা কারবারীর হোতা চেয়ারম্যান কাজী রুহুল আমিনের অফিস কক্ষ ভেঙ্গে চেয়ারম্যানের টেলিফোন দিয়ে ভোর বেলায় মহকুমা প্রশাসক গোলাম মর্তুজাকে ঘটনাটি অবহিত করে। মহকুমা প্রশাসক পুলিশ নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উক্ত চোরাই মাল সহকারে গাড়ী গুলো জব্দ করে। মহকুমা প্রশাসন এ বিষয়ে মহকুমার নেতা চেয়ারম্যান কাজী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ ঘটনায় কাজী রুহুল আমিন তত্কালীন একজন উপ-প্রধান মন্ত্রীর ফটিকছড়িস্থ বাড়ীতে আত্মগোপন করে। এতে মহকুমা শহরের একক নেতৃত্ব কাজী রুহুল আমিন গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে পলাতক আসামী হয়ে পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আসে। এতে চেয়াম্যান কাজী রুহুল আমিন সামাজিকভাবে হেয় পতিপন্ন ও রাজনৈতিক ভাবে মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ ঘটনায় মূলত ওয়াদুদের সাথে প্রভাবশালী এ নেতার বিরোধের অন্যতম কারন।

*** জাতীয় পার্টির স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনামলে এরশাদ সরকারের পতনের দাবীতে তৎকালীন বিরোধী দলীয় কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে স্থানীয় তৎকালীন এমপি’র সাথে এক রকম যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছে ওয়াদুদকে। অবশ্য আমরা তার সহযোগী ছিলাম এবং বড় ভাই মরহুম সাহাব উদ্দিন ভূইয়া ওয়াদুদকে সাহস ও অর্থের যোগান দিয়েছিলেন। ঐ সময়ে জাতীয় পার্টি তথা স্থানীয় এমপি ওয়াদুদকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে ভাড়া করা অস্ত্রধারী ও বোমাবাজ সন্ত্রাসীদের সমতল ভূমি থেকে নিয়ে আসে বিভিন্ন সময়। উক্ত সন্ত্রাসীদেরকে দিয়ে ওয়াদুদ ও তত্কালীন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের উপর হামলা চালাত এবং একাধিক বার ওয়াদুদের জীবন নাশের চেষ্টা করে। স্থানীয় ভাবে জাতীয় পার্টি তাদের আধিপত্য রক্ষার প্রাণপন চেষ্টা চালায়, কিন্তু ওয়াদুদের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কঠোর আন্দোলন সংগ্রামের কাছে স্থানীয় স্বৈরাচারী সরকারী দল জাতীয় পার্টি পরাভূত হয় এবং স্থানীয় ভাবে ওয়াদুদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ আন্দোলনের সফলতার মধ্য দিয়ে এবং ওয়াদুদের জনকল্যান মূলক কাজের সাফল্যে স্থানীয় জনগন ওয়াদুদের নেতৃত্বকে স্বাগত জানায়। এর সুফল হিসেবে স্থানীয় রামগড় উপজেলা নির্বাচনে ওয়াদুদের ভাই হিসেবে তার অপর বড় ভাই বেলায়েত হোসেন ভূইয়াকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করে। উল্লেখ্য বেলায়েত ভূইয়াকে উপজেলা চেয়ারম্যান করতে ওয়াদুদকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে জনগন, ভোটার ও জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসী সহ সব কিছুকে মোকাবেলা করতে হয়েছে ওয়াদুদ ও তার সহকর্মীদের।

বড় ভাই বেলায়েত ভূইয়ার উপজেলা নির্বাচনের (তৎকালীন) সময় তখনকার জাতীয় পার্টির এমপি আলীম উল্যাহ’র গুন্ডা বাহিনীর সাথে ওয়াদুদ যেভাবে মোকাবেলা করেছিল তা অত্যন্ত দু:সাহসীকতার পরিচয় বহন করে। আলীম উল্যাহ’র গুন্ডা বাহিনী কর্তৃক ভোট বাক্স ছিনতাই’র পর গুন্ডা বাহিনীর কিছু লোকের পিছু ধাওয়া করে তাদেরকে ওয়াদুদের নেতৃত্বে আমরা আটক করি। ভোট বাক্স ছিনতাইকারীদের হাতে বোমা এবং অস্ত্র ছিল। ওয়াদুদ খালি হাতে এগুলোর মোকাবেলা করে আমাদেরকে নিয়া। কতটা দু:সাহসীকতা থাকলে এরকমটি হয়!

বেলায়েত ভূইয়াকে ২য় বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতেও ওয়াদুদ ভূইয়াকে একইরুপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। জাতীয় পার্টির সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করে বেলায়েত ভূইয়াকে ২য় বারের মত উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। উল্লেখ্য ২য় বারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সরকারী দলের সন্ত্রাসীরা গুলি ও বোমা ফাটাতে ফাটাতে রামগড়ের লামকুপাড়া ভোট কেন্দ্র দখল করে। পুলিশ বিডিআর নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে তাদেরকে সহযোগীতা করে। উক্ত ভোট কেন্দ্র রক্ষার্থে ও স্বাভাবিক ভোট প্রদান অব্যাহত রাখতে ওয়াদুদের সহকর্মীরা পাল্টা হামলা করলে জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের উপর থেকে ওয়াদুদের সহকর্মীদের লক্ষ্য করে বোমা ও গুলি ছুড়তে থাকে। উল্লেখ্য কেন্দ্রটি ও সন্ত্রাসীরা ছিল পাহাড়ের উপরে। ওয়াদুদের সহকর্মীরা ছিল পাহাড়ের নিচে। এ ঘটনায় মহিউদ্দিন নামে ওয়াদুদের একজন সহকর্মী নিহত হয়। এতে ভোট কেন্দ্র গুলো নিরাপদ হয়ে যায় এবং ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগ করে। সারাদিনের যুদ্ধ শেষে সন্ধ্যা রাতে সরকারী দলের প্রার্থীকে পরাজিত করে বেলায়েত ভূইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষিত হয়। স্থানীয় প্রশাসন ছিল সরকারী দলের পক্ষে। পরাজয়টি যেন, প্রতিপক্ষের প্রার্থীর শুধু নয় প্রশাসনের অংশ স্থানীয় বিডিআরেরও হয়। এতে বিডিআরের তত্কালীন সিও ওয়াদুদের উপর প্রচন্ড ক্ষীপ্ত হয়। পরদিন সকাল বেলা প্রশাসন ও জাতীয় পার্টির যোগসাজশে পরিকল্পিত ভাবে সরকারি দলের গুন্ডা বাহিনী দিয়ে ওয়াদুদের আবাসস্থলে ওয়াদুদের উপর হামলা চালায়। ওয়াদুদ গুন্ডা বাহিনীকে মোকাবেলা করতে থাকলে গুন্ডা বাহিনীর পাশাপাশি বিডিআর এসে ওয়াদুদ ও তার সহ-কর্মীদের উপর হামলা করে এবং এতে ওয়াদুদ ও তার সহকর্মীরা আহত হয়। আহত অবস্থায় বিডিআর পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওয়াদুদকে গ্রেফতার করে। তৎকালীন সময় স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারি দলের সমগ্র অন্যায়, নির্যাতন ও হামলা-মামলা ওয়াদুদ মোকাবেলা করে এবং নেতা কর্মীদের খোঁজ খবর নেওয়া থেকে শুরু করে আহতদের চিকিৎসা ও সহকর্মীদের মামলা পরিচালনা করতে হয়। এ সকল অর্থের যোগান আসত তার জৈষ্ঠ্য ভাই সাহাব উদ্দিন ভূইয়ার কাছ থেকে। এভাবেই রাজনীতি এবং বৈরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যুবক ওয়াদুদ। যৌবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের জাতীয় পার্টিকে মোকাবেলা করতে ও বেলায়েত ভূইয়াকে রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে।

বড় ভাই সাহাব উদ্দিন ভূইয়ার প্রতি ওয়াদুদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ ছিল। যা কিনা তার নিজের রাজনৈতিক কাঙ্খীত লক্ষ্যে পৌঁচানোর একটি বড় সোফান। বড় ভাইয়ের শাসনকে সে অনায়াসে মেনে নিতেন, কোন প্রতিবাদ করতেন না।

মানুষের প্রতি ভালবাসার মানবিক উদাহরণ প্রসঙ্গ:

১। ১৯৮৬ সনের ২২ ডিসেম্বরের শান্তিবাহিনীর হামলার ঘটনায় নিহত, আহতদের জন্য মানবিক কর্মকান্ডে দু:সাহসীক ও জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সঙ্গী সহ-কর্মীদেরকে সাথে নিয়ে ওয়াদুদ প্রায় ২৯টি মৃত লাশ ও শতাধিক আহত ব্যাক্তিকে উদ্ধার করে নিহতদের দাফনে সৎকার সম্পন্ন ও আহতদের সু-চিকিৎসার সর্বোত্তম ব্যবস্থা গ্রহন করেন অতি দ্রুততার সহিত। সেদিন সে সহ তার সহ-কর্মীদেরও জীবন নাশের আশংকা ছিল। ওয়াদুদ এখানেই থেমে ছিল না। উক্ত শান্তিবাহিনীর হামলার পরবর্তীতে বাঙ্গালীরা যখন ক্ষিপ্ত হয়ে উগ্রমূর্তি ধারণ করে ঘটে যাওয়া বর্বর ঘটনার প্রতিবাদে, প্রতিশোধের স্পৃহায় রামগড় এলাকার পাহাড়িদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওয়াদুদ আমাদেরকে নিয়ে তা প্রতিহত করেছিলেন এবং ভীত সন্ত্রস্থ জীবন ও সম্পদ নাশের আশংকায় নিমজ্জিত নিরস্ত্র নিরীহ পাহাড়ীদের নির্বিকতায় পাশে দাড়িয়ে ছিলেন অতন্ত্র প্রহরীর মত, অভয় দিয়েছিলেন এবং তাদের জীবন রক্ষা ও সহায় সম্পদ, বাড়িঘর পাহারা দিয়েছিলেন, নিরাপদ রেখেছিলেন মাসের পর মাস। এতে স্থিতি ও স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছিল সে সকল পাহাড়ীদের জীবনে। উল্লেখ্য, এ জাতীয় পাহাড়ী বাঙ্গালীদের মধ্যে সংগঠিত একটি সংঘর্ষের ঘটনায় ওয়াদুদের বন্ধু অংক্যজাই মগ টকি দের বাড়ী আক্রান্ত হয় বাঙ্গালীদের দ্বারা। ওয়াদুদ বাঙ্গালী হয়েও ন্যায় সঙ্গত মানবিক কারনে বাঙ্গালীদের মুখোমুখী দাড়িয়ে টকি দের বাড়ী এবং বসবাসরত মানুষদের রক্ষা করে এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টকি কে ওয়াদুদের বাড়ীতে নিয়ে রাখে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত প্রায় মাসাধিক কাল টকি ওয়াদুদের বাড়ীতে ওয়াদুদের কক্ষে অবস্থান করে।

২। এছাড়াও একই বছর ১৯৮৬ সালের উক্ত ঘটনার কাছাকাছি সময়ে রামগড়ের খেদা নামক জায়গায় শান্তিবাহিনী নিরীহ বাঙ্গালীদের গলা কেটে ধান মাড়ার খুটির সাথে বেঁধে রাখে। সংবাদ পেয়ে আমরা ওয়াদুদের নেতৃত্বে ছুটে যাই ঘটনাস্থলে, নিরাপত্তা বাহিনী আসার পূর্বেই। আশ্বস্থ করি, সাহস দিই আহত-নিহতদের স্বজনদের এবং তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে আসি। অনুরুপ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তার টিম (সঙ্গীদের) নিয়ে শান্তিবাহিনী দ্বারা নির্মম পৈশাচিক হত্যাজজ্ঞ ও অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ খাগড়াবিল, পুরাতন নাকাপা, পাতাছড়া, বড় পিলাক ও মানিকছড়ির মলঙ্গী পাড়ার ঘটনায়। সে সকল এলাকার আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। নিহত ও অগ্নিদগ্ধ নিহতদের গণকবরের ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য ওয়াদুদ ভূইয়া তখন রামগড় (রাজনৈতিক) জেলার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ছিলেন। ওয়াদুদ ভূইয়ার এ সকল মানবিক ও দু:সাহসীক ঘটনা দেখে অবিভূত হন তৎকালীন নিরাপত্তা বাহিনী। যেমন- তৎকালীন খাগড়াছড়ির বিগ্রেড কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বীর-বিক্রম পি এস সি, তিনি তখন ওয়াদুদকে ধন্যবাদ জানিয়ে উৎসাহিত করেন। তখন ওয়াদুদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বিষয়টি বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম এখনো ওয়াদুদের দেখা পেলে এসব স্মৃতি রোমন্থণ করেন। ইব্রাহীমের অনেক গুলো গ্রন্থেও তিনি বিষয় গুলোর বর্ননা লিখতে গিয়ে ওয়াদুদের নাম উল্লেখ করেছেন। এ রকম অসংখ্য শান্তিবাহিনী দ্বারা সংগঠিত অমানবিক ঘটনায় ওয়াদুদ ভূইয়া ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাড়িয়েছেন অবলিলায়। সংসদ সদস্য থাকাকালীন ও এখনো এরকম মানবিক ঘটনায় ভূমিকা রাখছেন।

চলমান……………

Your Reply

আমার সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে,
ক্লিক করুন WadudBhuiyan.Com