আমার জীবনবৃত্তান্ত


.


জননেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার জীবনী

Wadud Bhuiyan
Wadud Bhuiyan
Leader is the Dealer of Hope. নেতা সাধারণ মানুষের জনগণের সকল আশা আকাঙ্খার প্রতিভূ। তাই নেতাকে ঘিরে আবর্তিত হয় বিশ্ব। পৃথিবীতে যত আবিষ্কার, যত সৃষ্টি কোনটিই নেতা করেননি কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কৃতিত্বই গেছে তাদের অধিকারে। কারণ নেতার নেতৃত্বে বিকশিত হয় প্রতিভা, উন্নয়ন আর সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার। নেতৃত্ব জন্মগত প্রবারণা। ঈগল কখনও ঝাঁকে ঝাঁকে আসে না, আসে একটি। ঠিক নেতার মত। কোন মানুষ যখন অসংখ্য মানুষের ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছায় একীভূত করার সক্ষমতা অর্জন করেন তখনই প্রকৃত নেতৃত্বের বিকাশ হয়। আমি ভূমিকা বলছি একজন ব্যক্তিকে নিয়ে, যিনি আমার সমবয়সী কিন্তু কর্মপ্রবারণায় আমার চেয়ে যুগ যুগান্তরের অধিক। তিনি হচ্ছেন ওয়াদুদ ভূইয়া।
Khaleda Zia and mother of W Bhuiyanআধুনিক খাগড়াছড়ির বিনির্মিতা প্রখ্যাত জননেতা জনাব ওয়াদুদ ভূইয়া ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি প্রাক্তন রাঙ্গামাটি বর্তমান খাগড়াছড়ির জেলার রামগড় মহকুমা শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ্ব সালেহ আহমদ ভূইয়া এবং মায়ের নাম আলহাজ্ব বিয়া ছালেহ। পিতা ছিলেন প্রখ্যাত সমাজ সেবক এবং ব্যবসায়ী হিসেবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলায় বিশেষ সুনামের অধিকারী। তার পিতা-মাতা উভয়ে ছিলেন ধার্মিক, শিক্ষিত এবং জনদরদী। কথিত হয়, তাদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিনেশ্বরের জমিদার এবং শেষ মুসলিম নবাব শমসের গাজির বংশধর। পিতামহ আলহাজ্ব আবদুল মজিদ ভূইয়া ছিলেন একজন বিশিষ্ট তালুকদার এবং তৎকালীন প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।  মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ পিতামাতার সন্তান ওয়াদুদ ছেলেবেলা থেকে ছিলেন আকর্ষণীয়  ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শিশুকাল হতে তিনি ছিলেন অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। পিতামাতার ছয় সন্তান-সন্ততির মধ্যে ওয়াদুদ ভূইয়া সর্বকনিষ্ঠ। তার ভাইবোনগণ হচ্ছেন যথাক্রমে জনাব সাহাবুদ্দিন ভূইয়া, জনাবা মীরা মফিজ, আলতাফ হোসেন ভূইয়া, বেলায়েত হোসেন ভূইয়া, জনাবা ননী হায়দার এবং Wadud Tarekজনাব ওয়াদুদ ভূইয়া। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়া আদর, শাসন ও ভালবাসার অনবদ্য লালিত্যে বেড়ে উঠেছেন সবুজাভ রামগড় শহরের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বলয়ে। যা তার জীবনে পরবর্তীকালে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কথায় আছে মর্নিং সোজ দ্যা ডেইজ। শিশুকালের পারিবারিক শিক্ষা, আদব-কায়দা, ধর্মীয় অনুশাসন ও উদার নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ ওয়াদুদ ভূইয়াকে গড়ে তুলেছে এক ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে। ওয়াদুদ ভূইয়ার দুই কন্যা সন্তান, বাঁশরী ওয়াদুদ ও অপ্সরী ওয়াদুদ।

বাড়িতে পিতা-মাতা ও পিতৃতুল্য বড় ভাই শাহাবুদ্দিনের নিকট ওয়াদুদ ভূইয়ার হাতেখড়ি। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রথমে শিখেন আরবি, তারপর বাংলা এবং ইংরেজি। উর্দু ও ফারসি শিক্ষাতেও পিছিয়ে ছিলেন না। স্থানীয় উপজাতীয়দের সাথে ছিল তার পরিবারের গভীর সম্পর্ক। হিন্দু ও বড়ুয়াসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছেও ভূইয়া পরিবারের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এর একমাত্র কারণ, পরিবারটি ছিল অসাম্প্রদায়িক। প্রচন্ড প্রভাব ও ধনশীল থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোন অহমিকা বোধ ছিল না। তাই মানবিক মূল্যবোধে তাড়িত ভূইয়া পরিবার আজও খাগড়াছড়ির সকল সম্প্রদায়ের কাছে প্রিয় নির্ভরশীল আকাঙ্খার প্রতীক।  ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রথম শিক্ষা আরবি। মায়ের কাছে সুর করে পড়তেন আমপারা। বাবা, মা আর বড় ভাই শাহাবুদ্দিন ছিলেন একদিকে শাসন আর অন্যদিকে স্নেহ ভালবাসা আর শ্রদ্ধার প্রগাঢ় অনুভূতি। তাদের কাছেই তিনি শিখেছেন কীভাবে বড় হতে হয়, বড় হতে হলে কীভাবে মানুষকে ভালবাসতে হয়। মানুষের নৈকট্য লাভের কৌশল তিনি তার পরিবারের কাছ থেকেই প্রথম শিখেছেন। তাই নেতা হিসেবে তার আবির্ভাব কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি তিল তিল চেষ্টা আর নিবিড় মগ্নতায় গড়ে উঠা অনিবার্য এক প্রাপ্তি।
123এবার সময় আসে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের। তার প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষালয় রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঐতিহ্যবাহী পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ কাটে পারিবারিক মন্ডলে। ওয়াদুদ ভূইয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে প্রেরণের পূর্বে পারিবারিক বলয়ে তিনি আরবি, বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দিসহ চাকমা ভাষাতেও দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তবে চাকমা ভাষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নয়, সামাজিকভাবে শিখে নিয়েছিলেন। এটি ছিল তার প্রতিভা এবং সার্বজনীন মননশীলতার বিশেষ দিক। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ওয়াদুদ ভূইয়া ঐতিহ্যবাহী রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। বড় ভাই শাহাবুদ্দিন যখন তাকে হাত ধরে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন তখন তার মনে এক অভূতপূর্ব অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। এখনও ওয়াদুদ ভূইয়া তার বড় ভাইয়ের সে স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন। ইস্, তিনি যদি এখনও জীবিত থাকতেন!
আজকের খাগড়াছড়ি তখন ছিল রামগড় মহকুমার অন্তর্গত মহালছড়ি থানার একটি ইউনিয়ন। পুরো এলাকায় রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিই ছিল একমাত্র ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মহকুমার কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মহকুমা প্রশাসকের সন্তান-সন্ততি হতে শুরু করে বিডিআর, সেনা অফিসার এবং মহকুমার অন্যান্য কর্মকর্তাগণের সন্তান-সন্ততিও অধ্যয়ন করতেন। তাই পার্বত্য এলাকায় হলেও রামগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কৌশলগত কারণে অনেকটা জাতীয় রূপায়নে বিন্যস্ত ছিল।

মোগল আমল হতে ভুইয়া পরিবারের ঐতিহ্য আর প্রভাব সম্পর্কে সবার একটি ধারণা ছিল। ওয়াদুদ ভূইয়ার পরিবারের সাথে মহকুমায় কর্মরত প্রায় সকল নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তার যাতায়াত ও সুসম্পর্ক ছিল। সে সুবাদে বিদ্যালয়ে ভর্তি হাবার পূর্বেই কর্মকর্তাদের সাথে ওয়াদুদ ভূইয়ার স্নেহ ও পিতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মূলত এটিই তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের সূতিকাগার। অন্যদিকে তার মায়ের উদারতা এবং সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার কারণে যারাই তাদের পরিবারে আসতেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সাদরে গৃহিত হতেন। এ গুণটাও জননেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার রয়েছে। এটি তিনি অর্জন করেছেন পারিবারিক পরিমন্ডল ও সামাজিক বলয় থেকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছেলে ও তার সতীর্থদের সাথে গড়ে উঠা নিবিড় বন্ধুত্ব এবং সহানুভূতিশীল সম্পর্ক ওয়াদুদ ভূইয়াকে যেমন গ্রহণযোগ্য মানসিকতায় ঋদ্ধ করেছে তেমনি সমৃদ্ধ করেছে উদার মননশীলতায়। তাই তার কাছে উপজাতি- অউপজাতি সবাই সমান। জন্মগত শিক্ষার চিরন্তন বাস্তবতা তাকে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের যে উদ্দীপনা দিয়েছে তা তার অতীত কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।
Very IMpoবৃক্ষ একদিনে ফলবান হয় না। তিলে তিলে বেড়ে উঠে, তেমনি ওযাদুদ ভূইয়াও একদিনে নেতা হননি। শিশুকাল হতে তার নেতৃত্বের বিকাশের সূত্রপাত। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলার লোভ সংবরন করা সম্ভব হচ্ছে না। তখন ওয়াদুদ সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। নাসির নামের একজন সতীর্থ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢলে পড়েন। পারিবারিকভাবে সে ছিল দরিদ্র। জানা যায়, না খেয়ে স্কুলে আসার জন্য তার এ অবস্থা। বন্ধু ও সতীর্থরা শুধু আফসোস আর সহানুভূতি দেখিয়ে যাচ্ছিলেন। ওয়াদুদ বুঝতে পারলেন শুধু সহানুভূতি দিয়ে কাজ হবে না। তিনি নাসিরকে কয়েকজন সতীর্থদের সহায়তায় বাড়ি নিয়ে যান। পিতামাতা ও বড় ভাই শাহাবুদ্দিন প্রথমে কিছুটা বিস্ময় দেখালেও ঘটনা শুনে আপ্লুত হয়ে উঠেন। তাদের আপ্লুত হবার কারণ ছিল। ওয়াদুদ যে কাজ করেছেন সেটি সাধারণ কোন ছেলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। যে ছেলে এ বয়সে এমন মননশীলতার অধিকারী, ভবিষ্যতে সে আরও বেশি হৃদয়বান হবে- এটাই ছিল তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। পরবর্তীকালে তাদের এ বিশ্বাস বাস্তবে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, এসএসসি পাশ না হওয়া পর্যন্ত নাসির ওয়াদুদ ভূইয়ার বাড়িতে ছিল। এখনও নাসিরের সাথে ওয়াদুদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট আছে। যদিও আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় উভয়ের অনেক তফাৎ রয়েছে। যে লোক ধনীগরিব আর উচু-নিচু পার্থক্যকে একাকার করে মানব জীবনের পঙ্কিল পথকে সমান্তরাল করে নিতে পারেন তিনিই তো নেতা!

বাবলু নামের ছেলেটির কথা আরও আকর্ষণীয়, আরও হৃদয়গ্রাহী। তিনিও ছিলেন ওয়াদুদ ভূইয়ার সতীর্থ। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পূর্বে সে অসুস্থ হয়ে যায়। মেধাবী ছাত্র বাবলুর বাড়ি ছিল ফেনী। রামগড়ে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে একা একা থাকতেন। একদিন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বলা যায় মুমূর্ষূ অবস্থা। তাকে দেখাশুনার কেউ ছিল না। ওয়াদুদ তাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। নাসিরের মত সেও এসএসসি পাশ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াদুদ ভূইয়ার বাড়িতে ছিল। ওয়াদুদ ভূইয়ার পরিবারে সে এমনভাবে ছিল, লোকজন মনে করত যেন সে ভূইয়া পরিবারের সন্তান, ওয়াদুদের ভাই।

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে জনাব ওয়াদুদ ভূইয়া পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, সে সময় পুরো বাংলাদেশে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল খুব কম। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি এসএসসি পাশ করেন। সে সময় রামগড় এলাকায় কোন কলেজ ছিল না। তাই তিনি চট্টগ্রাম হাজি মোহাম্মদ মুহসীন কলেজে ভর্তি হন। তার পিতামাতা এবং বড় ভাইয়ের কোন ইচ্ছা ছিল না স্নেহের ছোট ভাইকে অত দূরে প্রেরণ করা। কিন্তু রামগড় বা এর কাছাকাছি কোন উপযুক্ত কলেজ না থাকায় বাধ্য হয়ে মুহসীন কলেজে ভর্তি হন। তবে রামগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা হবার পর তিনি মুহসীন কলেজ ছেড়ে দিয়ে রামগড় কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন।
Jano Sanjokeবলা বাহুল্য, এসএসসি পাশ করার পূর্বেই ওয়াদুদ ভূইয়া ছাত্র নেতা হিসেব আবির্ভূত হন। শেখ মজিবুর রহমানের কথাও টেনে  আনা যায়। শেখ মজিবুর রহমানেরও  ঐ বয়সে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছিল। কথাটা বলার কারণ আছে। সে সময় রামগড় মহকুমায় কোন কলেজ ছিল না। বিষয়টি সবার মনে দাগ কাটলেও কেউ আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসেননি। কিশোর ওয়াদুদ কিন্তু থেমে থাকার পাত্র ছিলেন না। তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে রামগড়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। যা সে সময় শুধু এলাকার সাধারণ জনগণ নয়; কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সহানুভূতি অর্জন করেছিল। সংগতকারণে তিনি পুরো এলাকায় অপ্রতিরোধ্য ছাত্র নেতা হিসেবে আবির্ভূত এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। মহকুমা প্রশাসক গোলাম মর্তুজা ছিল তার মেন্টর। এ সময় একদিন প্রেসিডেন্ট জিয়া রামগড় আসেন। রামগড় তার নস্টালজিয়ার একটি বৃহৎ ক্ষেত্র। এ রামগড়ের ক্ষুদে ডাকঘরে বসে তিনি মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই রামগড়ের প্রতি তার আলাদা দরদ থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। দূরদর্শী ওয়াদুদ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে জিয়ার সাথে সরাসরি দেখা করেন তার সতীর্থদের নিয়ে। রামগড় হতে চট্টগ্রাম মুহসীন কলেজে গিয়ে পড়ার কষ্ট জিয়া বুঝতে পারেন। জিয়া বললেন, তুমি যা বলার সভায় বলো। আমি দেখবো। দারুন উৎসাহ বোধ করেন ওয়াদুদ। এ ঘটনা ওয়াদুদের পুরো জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দেন। এর পূর্বে তিনি কোন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গঠনের চিন্তা করছিলেন। কিন্তু জিয়ার সাক্ষাৎ তার পুরো পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দেয়। না, কোন কর্মচারী নয়, নেতা; নেতাই হবেন। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের মত এলাকার উন্নতি করতে হলে সরকারি কর্মচারী হওয়া যথেষ্ট নয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার জনসভার বিশাল জনসমক্ষে উপস্থাপনার দায়িত্ব পান ওয়াদুদ ভূইয়া। তিনি প্রথমেই রামগড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি করে উপস্থাপনার সূচনা ঘটান। ওয়াদুদের বর্ণনা এবং প্রয়োজনীয়তার হৃদয়গ্রাহী বিবর্ণন জিয়াকে এতই মুগ্ধ করেন যে, তিনি আসন হতে উঠে সরাসরি কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। মাথায় হাত বুলিয়ে চিবুকে হাত দিয়ে জিয়া বললেন: “তুমি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করে পুরো এলাকাকে উন্নয়ন আর প্রগতির ধারায় নিয়ে যাবার পথ সুগম করে দিলে। এমন তরুনই চায় দেশ।” এটি ছিল ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক আলী হায়দার খান ওরফে চাকমা খান কলেজ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জিয়া জেলা প্রশাসককে বললেন, ওয়াদুদরা এ শিক্ষাবর্ষ ধরবে। তুমি ত্বরিৎ কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা নাও।
Santiআজকের বিখ্যাত রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে এসএসসি উত্তীর্ণ ও কলেজে ভর্তিচ্ছু ছাত্র ওয়াদুদের নেতৃত্বে একদল কিশোরের অবদানের কাহিনী অবিশ্বাস্য হলেও এটি ছিল সত্য। শুধু তাই নয়, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া খাগড়াছড়ি সফরে এলে এসএসসি পাশ সে ক্ষুদে ছাত্রের পরিপূর্ণ বিকাশময় ওয়াদুদ কলেজটিকে সরকারি করার দাবি তুলেন। শহিদ জিয়ার মত তিনিও তার যৌক্তিক দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে রামগড় কলেজকে সরকারি করার ঘোষণা দেন। ঘোষণা দিলেও অনেক ঘোষণা কার্যকর হয় না। কিন্তু ওয়াদুদ, তো আর সাধারণ কোন নেতা নন। তিনি নিজের উদোগ্যে সরকারি সংশ্লিস্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে রামগড় কলেজকে সরকারি করে নেন।

কলেজ প্রতিষ্ঠা হবার পর ওয়াদুদ মুহসীন কলেজ ছেড়ে রামগড় চলে আসেন। ১৯৮২ খিস্টাব্দে এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮৫-৮৬ [শিক্ষা বর্ষ] খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে সমাজতত্ত্ব বিভাগ হতে বিএসএস (অনার্স) এবং এমএসএস পাশ করেন। তবে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের কারনে বার বার পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপ্ত করেন।
রাজনীতিতে তিনি শহিদ জিয়ার অনুসারী এবং ছাত্রদলে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিক জীবনের সূচনা ঘটান। ১৯৮০-১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি  বাংলাদেশ জাতয়তাবাদী ছাত্রদল রামগড় রাজনীতিক জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৭-১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহবায়ক এবং  সভাপতি ছিলেন। চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বকালীন বৃহত্তর চট্টগ্রামে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। ১৯৯০-১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, রামগড় রাজনীতিক জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৩-২০০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, খাগড়াছড়ি জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে জনাব ওয়াদুদ ভূইয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা শাখার সভাপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর নির্বাহী কমিটির সদ্স্য নির্বাচিত হন।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলা (সংসদীয় আসন নং-২৯৮) এ অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ৮ম নির্বাচনেও উক্ত আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সরকার তাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৯১ (পঞ্চম), ১৯৯৬ (সপ্তম) সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে অল্প ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। অধিকন্তু তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সামরিক বাহিনী শাসিত জরুরি সরকার রাজনীতিক কারণে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে হয়রানি করার জন্য খালেদা-হাসিনাসহ অন্যান্য রাজনীতিবিদগণের সাথে তাকেও বন্দি করে। তবে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কোনটিই প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। তাই সরকার তাকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জনাব ভূইয়া মামলা এবং হয়রানির কারণে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি।

43
ওয়াদুদ ভূইয়া একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। পরিমিতি বোধের সাথে রয়েছে তার ব্যাপক পরিমণ্ডল। রাজনীতি, লেখালেখি, সাহিত্যকর্ম, সামাজিক সংগঠন, বইপড়া, ডিজাইনিং, বক্তৃতা, লেকচার, আড্ডা ইত্যদি বিষয়ে তার শালীনতাময় আগ্রহ এবং অংশগ্রহণ সর্বমহলে প্রশংসিত। তিনি জীবনকে সবার সাথে সম অংশীদারিত্বে গ্রহণে বিশ্বাসী। তাই শুধু নিজের সুখ নয়; সবার সুখকে নিজের সুখ মনে করেন। সংগীতে তার আগ্রহ যেমন রুচিশীল তেমনি আকর্ষণীয়। মেহদি হাসান, আশা ভোসলে, কিশোর কুমার, শ্রীকান্ত আচার্য্য, রুনা লায়লা, হাবিব ওয়াহিদ প্রমুখ তার প্রিয় সংগীত শিল্পী। অভিনেতাদের মধ্যে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, মাধুরী দিক্ষিত, ঐশ্বরিয়া রায় প্রমূখ তার প্রিয়। খেলাধুলাতেও তার আগ্রহ রয়েছে। রাজনীতির চরম ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সুযোগ পেলে খেলাধুলা উপাভোগ করেন। ছাত্রজীবন হতে তিনি একজন ক্রীড়াসংগঠক ও ক্রীড়ামোদি হিসেবে পরিচিত। এলাকায় তিনি বহু ক্রীড়াসংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক। ফুটবল খেলোয়াড়ের মধ্যে আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা ও লিওলেন মেসি এবং ক্রিকেটে পাকিস্তানের ইমরান খান তার প্রিয় খেলোয়াড়। বিনোদনে তার মূল্যবোধ, উন্নত রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। তার পছন্দে রয়েছে অনুভবনীয় পবিত্রতা। সংগীত, সিনেমা, নাটক, টিভি শো প্রভৃতি নির্বাচনে তার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও সুরুচি উন্নত মননশীলতার পরিচয় বহন করে।

সরকারি ও ব্যাক্তিগতভাবে তিনি বহু দেশ সফর করেছেন। সে গুলোর মধ্যে আমেরিকা, কানাডা, লন্ডন, দুবাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, চিন, সুইডেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, স্পেন, সৌদি আরব প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
46পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুকালেই তার সমাজসেবা ও রাজনীতিক জীবনের সূচনা। তিনি রাজনীতিকে দেশের ও জনগণের উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তার রাজনীতিক আদর্শ যেমন মহৎ তেমনি পরিচ্ছন্ন। রাজনীতিক জীবনে তিনি যে সকল নেতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত তাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, নেলসেন মেন্ডেলা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আব্রাহাম লিংকন, থমাস জেফারসন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
5
মানব কল্যাণ তার জীবনের অন্যতম প্রত্যয়। ইতোমধ্যে তিনি বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পালিটোল ভবন নির্মাণ করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তিনি পৃষ্ঠপোষক। ওয়াদুদ ভূইয়াকে খাগড়াছড়িসহ আধুনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের সাবলীল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণপুরুষ বলা যায়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন  আর্থ-সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র  তার ঐকান্তিক প্রয়াসের নিবিড় মমতায় সমৃদ্ধ হয়েছে। পার্বত্য জেলায় তার আমলেই  সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সাবলীল ধারা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বাসস্থান, বনায়ন, অবকাঠামো বিনির্মাণ, সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, রুচিশীল বিনোদন, জাতিগত শান্তি প্রতিষ্ঠা, উপজাতীয়দের কল্যাণে বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণ, আয়বর্ধণ ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে স্বকর্ম সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূরীকরণে তার নিষ্ঠা ও কঠোর শ্রম পার্বত্য এলাকায়ে একটি নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। সবকিছু বিবেচনা করলে বলা যায়, এ যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানগণের মধ্যে তিনি নি:সেন্দেহে শ্রেষ্ঠ এবং বিচক্ষণ।
মানুষ, দেশ, জাতি ও সমাজের কল্যাণ তার সখ। মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা তার ব্রত, প্রতিমুহূর্তে সমাজের এবং সমাজের দুঃস্থ মানুষের কল্যাণে সামান্য হলেও কোন কিছু করা তার দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিগত সকল বিরোধ দূরীভূত করা, সকল জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি ও উন্নয়নের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকাকে বিশ্বের শ্রেষ্ট আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করা তার জীবনের স্বপ্ন। এ স্বপ্ন পূরণে তিনি নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত।
T1একজন জননেতার যেরূপ সাহস প্রয়োজন, সাহসকে যে কাজে ব্যবহার করা প্রয়োজন ওয়াদুদ ভূইয়া ঠিক তেমনি একজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামের বাঙ্গালীদের রেশন নিয়ে এক সময় ব্যাপক চাঁদাবাজি হত। হেলাল গং চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিত। নীরিহ সাধারণ লোকের সরলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে হেলাল গং প্রায় ২৬ হাজার পরিবার থেকে কার্ড প্রতি ৫ কেজি করে খাদ্য শস্য আদায় করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেন। এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ হতো স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স ডিভিশন থেকে। গুচ্ছগ্রামের রেশনও এ বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা হতো। হেলাল গং খোঁজ-খবর রাখতেন কখন রেশন বরাদ্ধ হচ্ছে। ডিও ইস্যুর সাথে সাথে হেলাল গং হুংকার দিতেন, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে গুচ্ছগ্রামের রেশন বরাদ্দ দেয়া না হলে খাগড়াছড়ি অচল করে দেওয়া হবে। আর রেশন আসার সাথে সাথে গুচ্ছগ্রামবাসীকে বোকা বানিয়ে রেশন এসেছে তার হুমকির কারণে এমন অজুহাত তুলে চাঁদাবাজি করতেন। স্থানীয় প্রশাসনও অজানা কারনে তাকে সহায়তা করতো। কী নির্মমতা সাধারণ মানুষকে নিয়ে একজন মানুষ করতে পারে তা ভাবলে মানুষ হিসেবে লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না।
সে সময় হেলাল গংদের এমন হীন কাজে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। হেলাল বাহিনীর সন্ত্রাসীদের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকত। এমন অবস্থায় হেলালের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে যে লোকটি সাহসীকণ্ঠে জনকল্যাণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি ছিলেন ওয়াদুদ ভূইয়া। তরুন নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রতিরোধের মুখে গুচ্ছগ্রামবাসী রক্ষা পান চাঁদাবাজ হেলাল গং থেকে। পার্বত্যবাসী ওয়াদুদ ভূইয়ার সাহস, দেশপ্রেম আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের উজ্জীবন শিখায় আপ্লুত হয়ে উঠেন। এতদিন তাদের মনে নেতৃত্বহীনতার যে সংকট ছিল তার দূরীভূত হতে চলেছে। জনগণ প্রবল আবেগে তরুণ নেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রত্যয় দীপ্ত সাহসে নিবেদিত কল্যাণময় কর্মকান্ডের সহযোদ্ধা হিসেবে এগিয়ে আসেন। পার্বত্যবাসী খুঁজে পান তাদের নেতা। যার প্রাণে সাহসের অণল, হৃদয়ে ভালবাসার দহন।
T5ভূইয়া পরিবারের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। সে ঐতিহ্যে লালিত ওয়াদুদ ভূইয়া জন্ম থেকে প্রতিবাদী। প্রতিবাদি যে কোন অন্যায়, অবিচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। উপরে বর্ণিত হেলাল গঙের ঘটনা ছাড়া এরূপ আরও অনেক ঘটনার কথা বলা যায়। তিনি রাজনীতিক জীবনের সূচনালগ্ন থেকে অনিয়ম ও দূর্নীতির  বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিবাদের অজয় হিমালয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ লক্ষাধিক ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানের অনিয়ম-দূর্নীতির প্রতিবাদ স্বরূপ পদত্যাগ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হলেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেন সেখানে ওয়াদুদ ভূইয়ার মত একজন তরুন নেতার এমন সাহসী ও নির্লোভ ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনুসরণীয় ও বিরল ঘটনা বৈকি।

বড় ভাই সাহাবুদ্দিন ভূইয়া জননেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার জীবনের একজন বিকল্পহীন অদ্বিতীয় বক্তিত্ব। তার জীবন সঞ্চরণ, প্রাপ্তি এবং উপলব্ধির প্রতিটি কণায় সাহাবউদ্দিনের ভূমিকা আলোবাতাসের মত অনিবার্য। গত ১৯ ডিসেম্বর ২০১২  খ্রিস্টাব্দে তার প্রাণপ্রিয় বড় ভাই সাহাবুদ্দিন ভূইয়া বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার এ্যাপেলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২ ঘটিকার সময় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল­াহে …… রাজেউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বৎসর। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও সাবেক এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব ওয়াদুদ ভূইয়ার বড় ভাই এবং জেলা যুবদলের সভাপতি দাউদুল ইসলাম ভূইয়ার পিতা জনাব আলহাজ্ব সাহাব উদ্দিন ভূইয়া ছিলেন একজন জনপ্রিয় নেতা ও সমাজসেবী। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৬ ছেলে ও ১ মেয়ে, ৩ ভাই, ভাতিজা, নাতি-নাতনী সহ অনেক আত্মীয় স্বজন ও গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তথা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শের পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে দক্ষতার সহিত জনসেবায় নিবেদিত থেকেছেন।
T2সংসদ সদস্য বলুন, আর আঞ্চলিক রাজনীতির কৌশল কিংবা গুণগত দিক বলুন; যেটি বিবেচনা করা হোক না কেন; খাগড়াছড়ি ও পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে ওয়াদুদ ভূইয়া অত্যন্ত দক্ষ এবং মহীয়ান গুণের অধিকারী একজন দূরদর্শী নেতা। পাহাড়ের জটিল রাজনীতির সমীকরণ বুঝেন তার মত দক্ষ এমন কোন নেতা পার্বত্য অঞ্চলে আর নেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয় জনগোষ্ঠীর গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনাতেও ওয়াদুদ ভূইয়া খাগড়াছড়ি তথা পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে উত্তম নেতা হিসেবে প্রতিভাত। কাজেই ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া আবার দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সচেতন মহলের কোন সন্দেহ নেই। সে হিসেবে খাগড়াছড়ি বিএনপিতে চলছে আন্দোলনের পাশাপশি জোর নির্বাচনের প্রস্তুতি।  তিনি আগের মত এখনও সর্বক্ষণ দলীয় নেতা কর্মীদের সাথে আছেন।

ওয়াদুদ ভূইয়া ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৯৪ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এরপর ওয়াদুদ ভূইয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়। তার আমলে  খাগড়াছড়িতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। তিনি পার্বত্য এলাকার সর্বত্র সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। যা সর্বমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়া কারাগারে আটক থাকায় সমীরণ দেওয়ানকে  মনোনয়ন দেওয়া হয়।  নির্বাচনে সমীরণ দেওয়ান আওয়ামীলীগ প্রার্থীর চেয়ে প্রায় অর্ধেক ৬২ হাজার ৯’শ ৭৭ ভোট পেয়ে শোচনীয়ভবে পরাজিত হন। বিষয়টি  বিএনপি’র নীতি নির্ধারনী মহলকে হতাশ করে তুলে। তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে, খাগড়াছড়ির রাজনীতিতে ওয়াদুদ ভূইয়ার বিকল্প নেই।

ওয়াদুদ ভূইয়া কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা আবার সু-সংগঠিত  হতে শুরু করে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপাসর্নের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) রুহুল আলম চৌধুরীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ওয়াদুদ ভূইয়াকে সভাপতি ও আবু ইউসুফ চৌধুরীকে সাধারন সম্পাদক করে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির কমিটি গঠিত হয়। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারিকে অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওয়াদুদ-ইউসুফের জমা দেওয়া পূর্নাঙ্গ কমিটি অনুমোদন পায়। অনুমোদিত ওয়াদুদ ভূইয়ার কমিটিতে সমীরন দেওয়ানকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রবীণ চন্দ্র চাকমা নিশ্চিত করে বলেন, ওয়াদুদ ভূইয়াকে সভাপতি করে বিএনপির কমিটি যাতে অনুমোদন না হয় তার জন্যে দেশি-বিদেশি বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। তারপরও জনপ্রিয়তা, রাজনীতিক বাস্তবতা, সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দাবি প্রভৃতি বিবেচনায় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ওয়াদুদ ভূইয়ার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে অনুমোদন দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে পাহাড়ের বিএনপির রাজনীতিতে ওয়াদুদ ভূইয়ার কোন বিকল্প নেই। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদনে এখন জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়ার একক নেতৃত্বে সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়া খাগড়াছড়ি আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাচ্ছেন এটা যেমন নিশ্চিত, তেমনি তিনি  বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হবেন। কারণ এ অঞ্চলের পাহাড়িরাও মনে করেন, অতীতে ওয়াদুদ ভূইয়ার নেতৃত্বেই তারা সবচেয়ে বেশি নিরাপদে ছিলেন এবং আগামীতেও থাকবেন। কারণ তার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, মানবহিতৈষী মনোভাব, দলের জন্য ত্যাগ, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকা ওয়াদুদ ভূইয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অবিসংবাদিত হিসেবে গড়ে তুলেছে। এ বিষয়ে তার বিরোধীদেরও কোন সন্দেহ নেই।
ক্রমশ-

Your Reply

আমার সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে,
ক্লিক করুন WadudBhuiyan.Com