Showing posts with label একুশ. Show all posts

একুশ আমার প্রেরণা!


.

একুশ আমার, আমাদের ভিত্তিভূমি, বাঙালির আত্বপরিচয়ের বাহন। টিকে উঠার প্রেরণা। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহাসিক পটভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রাচীর। আজ আমি স্মরণ করছি তাদের, যারা এই ভিত্তি রচনা করে গেছেন আমাদের জন্য তাদের জীবন দিয়ে। তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ছবি : শহীদ মিনার @বিডিনিউজ২৪ ডট কম


আজকের এই দিনে আমার একটি দিনের কথা মনে পড়ে গেল। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। মহকুমা শহর রামগড়ে মহকুমা প্রশাসনের উদ্যোগে একুশে ফেব্রুয়ারির আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে। কাকতালীয়ভাবে তখন রামগড় মহকুমা সদরে একটি বড় আকারের মেলা চলছিল। মেলার বিশাল প্যান্ডেলেই এই আলোচনা সমাবেশটি হচ্ছিল। সমাবেশে অনেক গন্যমান্য ব্যাক্তিরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন অনেক ছাত্র-যুবক।

সাধারনত এ জাতীয় সমাবেশে এত মানুষ জমায়েত হয় না, কিন্তু বাড়তি আকর্ষন ছিল জমজমাট মেলা। যে কারনে সমাবেশটি ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। স্কুলের ছাত্রদের সাথে দর্শক হিশেবে আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। এসডিও (বর্তমান জেলা প্রশাসকের পদমর্যাদায়) সাহেব সেখানে প্রধান অথিতি হিশেবে উপস্থিত ছিলেন। একই সাথে ছিলেন মহকুমা প্রশাসনের সমস্ত বিভাগীয় কর্মকর্তাবৃন্দ। অবশ্য ঐ মেলাতে সকল সরকারী বিভাগের একটি করে স্টলও ছিল, কর্মকর্তাদের উপস্থিতির এটিও একটি কারন হতে পারে। কারন এই দিনটি ছুটি থাকে বলে, অনেক কর্মকর্তাই বাড়ি চলে আসেন। কিন্তু সেদিন প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্বালে আমাদের স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ইসমাইল হায়দার স্যার ছাত্রদের সাথে কি যেন কানাঘুষা করছেন! এক পর্যায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন। এসে বললেন, তুমি কি আজকের এই অনুষ্ঠানে এই দিবশের উপর বক্তব্য দিতে পারবে? কতৃপক্ষ স্কুলের পক্ষ থেকে একজন বক্তা চাচ্ছে। শুনে আমি চমকে উঠে ভাবলাম, সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে এত ছাত্র-শিক্ষক থাকতে আমাকে বললেন কেন! মৃদু আগ্রহ-অনাগ্রহের দোলাচালে হঠাৎ বলেই বসলাম, স্যার আপনারা চাইলে দিতে পারবো। স্যার বললেন, বেশ! এদিকে আসো- বলে আমাকে এই বিশাল মেলার প্যান্ডেলের এক কোনায় নিয়ে গিয়ে বললেন, তুমি কী বলতে পারবে আমাকে একটু শুনাও তো! আমি যা পারলাম স্যারকে শুনালাম। স্যার শুনে খুশী হলেন এবং তিনি নিজ থেকে আমাকে আরও কিছু পয়েন্ট ধরিয়ে দিলেন। আমি প্রস্তুত! কিন্তু শরীর কাঁপছে। অনুষ্ঠানের শুনশান নিরবতা ভেদ করে মাঝেমাঝে আমার মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করছে, এই বুঝি উপস্থাপক আমার নাম ডাকবেন! এক পর্যায়ে আমার পালা এলো। কাঁপাকাঁপা শরীরে কিন্তু বীরদর্পে মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম ডায়াসে। তাৎক্ষণিক প্রস্তুতির একুশের যতটুকু জানার সবটুকু ঢেলে দিলাম। বক্তব্য শেষে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরতেই সমগ্র দর্শক- ছেলেবুড়ো, কর্মচারী-কর্মকর্তা- সকলের মুহুর্মুহু করতালি! আমি বিমুগ্ধ হয়ে ভাবতে ভাবতে নামছি, কি এমন আমি বললাম যে এত তালি!

এমনি সময় প্রধান অথিতি এসডিও গোলাম মর্তুজা সাহেব সস্নেহে কাছে ডেকে নিয়ে পাশে বসালেন। আদর করে অভিনন্দন জানিয়ে উৎসাহ দিলেন। আমি নেমে আসলাম দর্শকসারিতে। কিছুক্ষণ পর নিজের মধ্যে স্থিরতা ফিরে পেলাম। ইতোমধ্যে স্কুলের ছাত্র ভাইয়েরা সবাই এসে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। সেদিনই আমার ভেতরের মন ওখানেই বারবার বলছিল, তুমি পারবে, পারবেই! এগিয়ে যাও! সেই থেকে আমার এই পথ চলা! সেই একুশই আমার অনুপ্রেরণা! আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি, আমি পারছি কিনা। জানি না কখনও তা জানতে পারবো কিনা।

মজার ব্যাপার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হতে গেলাম, ভাইবা বোর্ডের প্রধান, তৎকালীন সমাজতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান, আজকের বরেণ্য বুদ্ধিজীবি, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ডঃ অনুপম সেন আমাকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বলতে বললেন! সেই সময়ের জানাটুকু পাশ কাটিয়ে, নিজের অজান্তেই ফিরে গেলাম সেদিনের নবম শ্রেণীর বয়সে দেয়া সেই বক্তব্যে! এবং ঐ কথাগুলোই ছিল ভাইবা বোর্ডের আমার উত্তর। আমার পরবর্তীর এই শিক্ষক, আমার উপর ভাইবা বোর্ডে সেদিন সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এই কথাগুলো আমি '৫২-র সেই কথা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে বলতে ইচ্ছে করলো। সবাইকে আমার ভাষার যুদ্ধের রক্তিম শুভেচ্ছা।

আসুন আজ সবাই গেয়ে উঠি আমাদের কথার সংগীত,
"আমার ভাইয়ের রক্তে
রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি?"

"আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর
আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলার কথা কই
আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি, বাংলায় জেগে রই
আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
আমি সব দেখেশুনে খেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার
বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীর-ধনুক
আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।"