আজ রাত তখন প্রায় নয়টার বেশী, সাবেক এক মন্ত্রী, একজন সাংবাদিক বন্ধু ও আমি বসে চা নাস্তার ফাঁকেফাঁকে আলোচনা করছিলাম, সাবেক এক মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায়। হঠাৎ করে মন্ত্রী সাহেব টিভিতে চোখ রেখে আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, দেখো দেখো! আমরা তখন টিভি স্ক্রলের শিরোনামে দেখলাম চ্যানেল আইয়ের ইসলামিক অনুষ্ঠান 'কাফেলা'র উপস্থাপক ও বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ নুরুল ইসলাম ফারুকীকে অজ্ঞাত কিছু সন্ত্রাসী তার নিজ বাসায় ঢুকে গলাকেটে হত্যা করেছে।
নিউজটি পড়ে আমরা নির্বাক হয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। কোন হিসাবই আমাদের মিলছে না। কেন, কারা তাকে হত্যা করতে পারে? টিভি থেকে এর বেশী খবর তখন দিতে পারছে না, বুঝাই যাচ্ছিল। আমারা দ্রুত অনলাইলে ঢুকলাম, কিন্তু এর বেশী খবর তখন অনলাইনেও আসে নাই। দীর্ঘক্ষন আমরা আর অন্য কোনো আলোচনায় যেতে পারলাম না। কারণ সাবেক মন্ত্রী মহোদয় বারবার আফসোস করছিলেন আর বলছিলেন, আহা লোকটা বিশ্বের দুর্লভ ইসলামিক ও মুসলিমদের ঐতিহাসিক স্থান সমূহের ছবিগুলো দেখাতো টিভিতে। দেখে অনেক ভাল লাগতো।
এক পর্যায় তিনি সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী মনে হচ্ছে? এই হত্যাকান্ডের সাথে কারা জড়িত থাকতে পারে? (আগেই বলে রাখলাম, আমি জানিনা ভুল বলেছি কিনা, ভুল বললে ক্ষমা করবেন পাঠক) আমি কোনোরুপ সময় না নিয়েই বললাম, এতে সরকার জড়িত থাকতে পারে! তিনি বললেন, তাতে সরকারের কী লাভ? আমি বললাম, আমার মনে হচ্ছে সরকার তাদের পতনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে, তাই তাদের আরেকটা নাটকীয় ঘটনা ও টার্নিং পয়েন্ট দরকার এবং সেই ঘটনা ও পয়েন্ট বোধহয় এটা!!
সরকারই এই নিরপরাধ ধর্মীয় লোকটাকে বেঁচে নিয়েছে এবং তাকে বলি দিয়েছে। কারণ সরকার বোধহয় আরেকবার পশ্চিমাদের ও ভারতকে বুঝাতে চাচ্ছে বাংলাদেশে মৌলবাদ সত্যিই আছে এবং তা পরিনত হতে পারে জঙ্গিবাদে , যদি এদেশে তাদের মত দল ও সরকার ক্ষমতায় থাকতে না পারে। তাই এমন জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে এবং থাকতে হবে। তা জরুরী, এটি বুঝানোর জন্যই সরকার এই কাজটি করে থাকতে পারে।
আমি আরো বললাম, নিকট অতীতে তাকিয়ে দেখুন হঠাৎ করে হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরে চলে আসলো কোন বাধা ছাড়াই, নির্বিঘ্নে। হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ আসলো কিন্তু তারা জানতো না, হেফাজতের ওই আন্দোলনের ভেতরের কারণ কি! আসলে সরকার হেফাজতের ওই আন্দোলনটা তৈরী করে আবার নির্বিচারে গুলি করে মাওলানা মেরে পশ্চিমাদের বুঝাতে চেয়েছে দেখুন আপনারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘঠেছে এবং তা একমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষেই সম্ভব দমন করা, আর বাকীরা সবাই জঙ্গিদের সাথে জড়িত বা উস্কানি দাতা। কারণ একটু খেয়াল করলেই দেখবেন আজকের অবৈধ সরকারের পুরষ্কার প্রাপ্ত জাতীয় পার্টির মন্ত্রী আনিসুল হক মাহমুদ, জিয়া উদ্দিন বাবলু ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ কয়েকজন হেফাজতের নেতাদের সাথে সরকারের পক্ষে গোপন শলা-পরামর্শ করেই হেফাজতের হাজার হাজার নিরীহ নেতা-কর্মীকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং সারা দুনিয়াকে দেখাতে চেয়েছে দেখো তোমরা, এদেশে হাজার হাজার টুপি ওয়ালা দাঁড়ি ওয়ালা এই মানুষগুলোই হচ্ছে জঙ্গি, আর আমরা আওয়ামী সরাকারই রাত জেগে তাদেরকে নিপাত করছি। মজার ব্যাপার হলো, সেই হেফাজত নিপাত জজ্ঞের প্রামাণ্য চিত্র (ভিডিও) সেই কালো রাত শেষ হওয়ার পর পরই সরকার সারা দুনিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয়। আরো খেয়াল করুন হেফাজতের সাথে শেষ দফারফা (মিমাংসা) করার বিষয়টিও ওই একই মন্ত্রীরাই করেছিল!!!
আমার সন্দেহ আরো ঘনিষ্ট হচ্ছে সেখানেই, যেখানে মাওলানা ফারুকী হত্যাকান্ডের পর পরই রাত ১২ টার মধ্যেই সরকার সমর্থক ইসলামিক দলগুলো আগামী রবিবার সারাদেশে হরতাল ঘোষনা করে এবং তারা কোন প্রকার তদন্তের আগেই জামায়াতে ইসলামিকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করে। এবং খেয়াল করুন এই ঘটনার মাত্র দু'দিন আগেই সরকার প্রধানের পালিত ও সংসদে ঘোষিত আশ্রিত শামিম ওসমান বলেছেন "বিএনপি জামায়াতকে দমন করার জন্য সে একাই যথেষ্ট" পাশাপাশি এ ঘটনার পরপরই খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই কর্মসুচি এসেছে এবং সরকারের পালিত মিডিয়াগুলোতে শ্যামল বিদ্রোহীরা জঙ্গিবাদের গন্ধ পাচ্ছে, বিষয়গুলোকে পরিকল্পিতই মনে হচ্ছে, আরো মনে হচ্ছে সব কিছুই যেন সাজানো।
এখন দেখার ও বের করার বিষয়, এই ইসলামিক চিন্তাবিদ হত্যাকান্ড ও এর প্রতিবাদে সরকারের পালিত ইসলামিক দলগুলো দিয়ে হরতাল ডাকার মধ্যে সরকার কতটা জড়িত।
আরেকটা বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, দুনিয়ায় বারে বারে, যুগে যুগে স্বৈরাচারী সরকারগুলো তাদের অবৈধ ক্ষমতা রক্ষার জন্য এমন অনেক অপকৌশল নিয়ে থাকে কিন্তু তা কখনও কখনও আত্নরক্ষার পরিবর্তে আত্মনাশ হয়ে যায়, চোখ রাখুন দৃশ্যপটে, সঠিক উত্তর পেলে পেতেও পারেন।
