আমার এক বন্ধু বাবুল


.

আমার এক বন্ধু বাবুল, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরিচয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই। নুতন নতুন ছেলেদের সাথে এই সময়ে ক্লাশমেট বা অন্যান্য ডিপাটমেন্টের ছাত্রদের একে অপরের সাথে পরিচয় শুরু হয়।
প্রথম থেকে দেখতাম বাবুল আর আলম নামে দুই বন্ধু মানিকজোড়ের মত রাজকিয়ভাবে ক্যাম্পাসে আসতো। বাবুল কালো আর আলম ফর্সা। প্রথম বর্ষ থেকেই আমাদের ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের পথ চলা। ওরা দুজন শহর থেকেই আসতো, আমি কখনো হলে কখনো বা শহেরের বাসায় থাকতাম। যেকারনে আমাদের সব সময় মেলা মেশার সুযোগ ছিললা। তবুও আমরা ভালো বন্ধুই হয়ে উঠলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় জিবন শেষে আমাদের অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। তবে এখন পর্যন্ত আমার সুখেরদিনে না হলেও দূ:খের দিনে ওরা আমার খবর নিয়ে থাকে।
গত ২/৩ বছর থেকে আমি চট্টগ্রাম গেলেই তাদের সাথে প্রায় সন্দ্যায় আড্ডা হয়। কিন্ত প্রতিদিন লক্ষ করতাম রাত ৯ টা বাজলেই বাবুল সাসায় যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দিতো। আমি ও কেউ কেউ এতে একটু বিরক্তই বোধ করতাম, কিরে বাবা এতোদিন পরে বসলাম বাবুল এতো তাড়াহুড়ো করে কেন? সেকি বউ এর পিটুনি খাওয়ার ভয়ে এমন করছে নাকি? পরে যাননাম, না।তার মা নেই বাবা দীর্ঘদিন থেকে খুব অসুস্থ। সময় মত বাবাকে ভাত খাওয়ানো, ঔষুধ খাওয়ানো, ইন্সুলিন দেয়া সব কিছু দীর্ঘ বছর যাবত বাবুলই করে আসছে। বাবুলের ছেলে মেয়েরা এখন প্রায় কলেজ লেভেলে পড়াশনা করে। সে ভালো ব্যবসা করে, সাংসারিক সবকিছু সামলিয়ে সব সময় সে তার বাবাকে এই সেবাগুলো দিয়ে যায়। একপর্যায়ে যখনই আমার সাথে তার মোবাইলে বা সরাসরি কথা হতো আমি তার বাবার খোজ খবর নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, তার বাবার মাঝে মধ্যে অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়, আবার সুস্থ হয়ে উঠে। কখনো কথা বন্ধ হয়ে যায় বা বুঝা যায় না তখন বাবুলেই তার বাবার শারিরিক ভাষা বুঝে নিয়ে প্রয়োজনিয় কাজ গুলো সেরে দেয়, প্রায় সারারাত জেগে অপেক্ষায় থাকে তার বাবার কখন কি প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এক সময় পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়, নিজে করতে পারে না। ডাক্তার বলে দিয়েছে তিনি আর কখনো নিজে থেকে টয়লেট সারতে পারবেন না। কিন্তু বাবুল থেমে থাকেনি সে বাবাকে যথা সময়ে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে তার হাতে গ্লাফস লাগিয়ে বাবার পায়খানা বের করে আনতো মাসের পর মাস। এক সময় অলৌকিকভাবে তার বাবা আবার নিজে থেকেই পায়খানা করতে সক্ষম হয়ে উঠলো যা কিনা ডাক্তারের বিশ্বাষ করতেই কষ্ট হচ্ছিল, এ কি করে সম্ভব! এভাবেই যাচ্ছে বাবুলের জিবন। মাঝ রাতে হটাৎ করেই ডাকশুনা যায় বাবুল, বাবুল। শব্দ শুনে বাবুল দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেষ করে বাবা তুমি আমাকে ডেকেছো? কি লাগবে তোমার? বাবা কখনো নিজের চাহিদা জানায়, কখনো বলে কই আমি কি তোকে ডেকেছি? কিন্তু বাবা প্রায় সন্তান বাবুলকে নিজের অজান্তেই ডেকে যায়। বাবুল যেন অসুস্থ বাবার আত্বার আত্বা হয়ে গেছে তাই সব সময় তার বাবার একটা প্রশ্ন বাবুল কই, বাবুল আসছো, বাবুল কখন আসবে। তিনি বুঝেনই না বাবুলের বাহিরে যেতে হয়, কাজ করতে হয়। তিনি বুঝেন বাবুল নামক সন্তানটা তার অন্তর আত্বা, তার আশ্রয়দাতা, তার বেচে থাকার উৎসাহ ও অবলম্বন। তিনি আর কিছুই বুঝেন না বা বুঝার বোধশক্তি উনার নাই।
আজ শুনলাম সেই মানুষটা সেই অসহায় বাবাটা আজ ভোর রাতে মারা গেছেন। (ইন্নালিল্লাহ.......)
কথাগুলো তুলে ধরলাম এজন্যই বর্তমানে হাজার হাজার এমন অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা দের বৃদ্ধা আশ্রমে থাকতে হয় কিন্তু বাবুলের বাবাকে সেভাবে থাকতে হয়নি। ধন্যবাদ বাবুল তোমাকে, যে বাবা তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজকীয়ভাবে পাঠাতো আজ তুমি সেই বাবাকে রাজকীয়ভাবেই পরপারে বিদায় জানালে, ধন্য বাবার ধন্য ছেলে। দোয়া করি যুগ যুগ বেঁচে থাকো তুমি। বাবুল এখন থেকে আর তোমাকে তাড়াতাড়ি বাসায় না ফিরলেও চলবে, জাগতে হবে না রাত, বাবুল বাবুল করে আর কেউ ডাকবে না! তোমার চলে আসা রুটিন আজ পাল্টে গেলো, নতুন রুটিনে আসতে তোমার সময় লাগবে, এখন মাঝে মাঝে ধাক্কা লাগবে তোমাকে মাঝিরাতেও কেউ যেন ডাকছে। দোয়া করি আল্লাহ যেন সেই শোক কাটিয়ে উঠার শক্তি দেন তোমাকে। এও আশা করি একদিন তুমি তোমার সন্তানদের থেকেও পাবে তেমনি সমাদর।