পহেলা বৈশাখ, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ


.

পহেলা বৈশাখ আজ এমন একটি উৎসবে পরিনত হয়েছে যা দেখলে বিশেষ করে ঢাকায় মনে হয় অন্যরকম এক প্রাণের মেলা, এইদিনটিতে রাস্তা, ঘরবাড়ি, হল, কমিউনিটি সেন্টার, ক্লাব, হোটেল, ফাইভ স্টার হোটেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা পার্ক যেদিকেই তাকাবেন, দেখবেন সবাই ব্যস্ত, আনন্দ ব্যস্ত। সারা শহরের দিকে তাকালে আপনার মনে হবে এটি যেন ঈদ, দুর্গোৎসব বা বড়দিনের উৎসবকে অতিক্রম করে ফেলেছে। তবে তা মনে হয় আরো প্রায় ১০/১৫ বছর আগেই অতিক্রম করে ফেলেছে। শুধু ঢাকা কেন এখনতো এটি জেলা ছাড়িয়ে উপজেলা, কোথাও কোথাও ইউনিয়নে চলে গেছে। দেশের বাহিরে যে দেশেই বাঙ্গালিরা আছে সেখানেই বৈশাখ পালন হচ্ছে ধুমধাম করেই। ঈদে বা পূজায় মানুষ যে পরিমান নতুন কাপড় ইত্যাদি কেনাকাটা করে তার চেয়ে অনেক বেশি কেনাকাটা করছে পহেলা বৈশাখে। দোকানগুলো খালি থাকেনা, কাপড়ের দোকান বা টেইলার শপগুলো ডেলিভারি দিয়ে কুলোতে পারছেনা।
আসলে এই উৎসবটি সম্মিলিত বাঙ্গালির উৎসবে পরিনত হয়েগেছে বহু আগেই। আমি জানি আমার এই কথায় আমার সাথে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করবেন। করতেই পারেন। আমার দীর্ঘদিন থেকে তাই মনে হচ্ছে, দেখে, বুঝে এবং জেনে আমি আমার ধারনাগত মতামত তুলে ধরলাম মাত্র।

ঈদ যখন আমরা করি তখন শুধু মুসলিমরাই করি, পুজা করে শুধুই হিন্দুরা আর বড়দিন করে এদেশের বাঙ্গালি খৃষ্টানরা, আমাদের দেশে যাদের কথা বলছি এরা সবাই বাঙ্গালি। ধর্মে আমরা ভিন্ন ভিন্ন হলেও আমরা যেমন কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু বা সনাতনী, কেউ খৃস্টান। সবাই কিন্তু বাঙ্গালি। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে ধর্ম আগে না বাঙ্গালি আগে? আমি এই বিতর্কে যাবো না। অন্তত আমরা সবাই এটাতো মানবো আমরা বাঙ্গালি, এক সময় আমাদের বাবা, দাদা, আরো আগের, আরো আগের প্রজন্ম বাঙ্গালী ছিল। বছরের এইদিনে হাল খাতা হতো, দোকানি বকেয়া আদায় করতো, ক্রেতা নতুন জামা পরে দোকানে গিয়ে বকেয়া পরিশোধ করতো, দোকানী সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতো। গ্রামে গ্রামে মেলা বসতো শত শত ছেলে মেয়ে, ছাত্র যবুক, বুড়ো সবাই বৈশাখী মেলায় যেতো। এখন যুগের সাথে কালের পরিবর্তনশীলতায় বৈশাখী মেলাও পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। এটা বঙ্গের সংস্কৃতি, বাঙ্গালির শিকড়। একে অবহেলা কিংবা অন্যভাবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। হয়ত এই বৈশাখ উদযাপন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবে হয়ত পালন হচ্ছে না, আমি যেভাবে চাইছি সেভাবে হয়ত পালন হবেনা। মানুষ মাত্র মতের ভিন্নতা থাকবে কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই, যদি আপনি এটুকু স্বীকার করেন পহেলা বৈশাখ বলতে বাঙ্গালির কিছু একটা ছিল। তাহলে আপনাকে পহেলা বৈশাখ মানতে হবে, এখানে আসতেই হবে। বরং এখানে এসেই আপনার চিন্তাগত ভিন্নতার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু দুরে থেকে এর বিরুদ্ধাচরণ করে এটিকে থামাতেও পারবেন না, ঠেকাতেও পারবেননা। বরং এর ভক্ত সমর্থক দিন দিন বেড়েই চলছে, যা চলা উচিৎ।



আমাদের বুঝতে হবে পহেলা বৈশাখের সাথে ধর্মের মানে কোন ধর্মের সাথেই বিরোধ নাই। যেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধের সাথে ইসলামের বিরোধ নাই। আমাদেরকে এসব বিবেচনা করেই চলতে হবে, এগুতে হবে। এই বিষয়গুলো গভীরভাবে ভাবনায় না আনায় বরং এই অতি মূল্যবান ইস্যুগুলো নিয়ে দেশের একটি গোষ্ঠী চেতনার ব্যবসা করছে এবং জাতীয়তাবাদীদের আঘাত করছে এই ইস্যুগুলোকে পুজি করেই। যেমন ধরুন যেহেতু শহিদ জিয়া একজন খাটি মুক্তিযোদ্ধা, আর তারই জম্ম দেওয়া দল মুক্তিযুদ্ধের সুবিধাভোগী হতে পারবে না, এটা কেমন করে হয়?

বাংলাদেশের মৌলিক দুটো ইতিহাস যদি আপনি খোঁজেন, যা আজকের নতুন প্রজম্ম খুজছে এবং আসক্ত হয়ে পড়েছে তা হলো এক. মুক্তিযুদ্ধ, দুই. বাঙ্গালির লোক সংস্কৃতি, আবাহমান কালের বাঙ্গালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি পহেলা বৈশাখ। এই দুটো অতি গুরুত্বপূর্ন বিষয়কে আপনি আমি এড়িয়ে চলার কারণেই এদেশের অপগোষ্ঠীটি মহা মূল্যবান এই বিষয়গুলোকে হাতিয়ার বা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে, জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে। এই হাতিয়ার তাদেরকে একতরফাভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া কোনভাবেই ঠিক হবেনা। এই হাতিয়ার ধরে ফেলতে হবে, অধিকার নিয়েই এই হাতিয়ারে ভাগ বসাতে হবে। এর থেকে দুরে থাকা মানে বিশাল এলাকা, বিশাল ইস্যু ও বিশাল অনাগত প্রজম্মের পর প্রজম্ম প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া। তা কেন হবে। মুক্তিযুদ্ধ এদেশের সবার, তেমনি নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখও দেশের সবার। তাই এর ভাগিদারী কেন শুধু তারা একাই হবে বা নিবে? আমরা নয় কেন? তাই আসুন সবাই মিলে এখন থেকে এমন করেই ভাবি এবং এই চিন্তার বাস্তবায়ন করি।