খবরে দেখলাম গত ২৭ জুলাই ১৪, রবিবার - রবিন নামে একজন তরতাজা যুবক ঢাকার টিপু সুলতান রোডে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনিতে মারা গেছে। পুলিশও তাই বলছে। অবশ্য রবিনের ডেকোরেশন ব্যবসায়ী বাবা সহ আত্মীয়-স্বজন আত্মবিলাপ করছে আর রবিনকে পুলিশ পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে জোরালো অভিযোগ তুলেছে। কারণ হিসাবে বলছে, রবিনের ডেকোরেশন ব্যবসায় পুলিশ ঈদ উপলক্ষে চাঁদা দাবি করলে, রবিনরা দাবি অনুযায়ী পুলিশের প্রত্যাশিত টাকা দিতে পারেনি। তাই পুলিশ ক্ষোভ ও অভিমানে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজিয়ে নিজ দোকানের পাশে অবস্থানরত রবিনকে ছিনতাইয়ের নায়ক বানিয়ে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দিয়ে হত্যাকর্মটি সমাপ্ত করেছে এবং পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি এনজয় করেছে! যদিও এবারের ঈদে ঢাকার প্রায় প্রতিটি অভিজাত এলাকার থানাগুলোকে ডেকোরেশনের দোকান থেকে 'উপহার' হিসাবে প্রাপ্ত সাজসজ্জা এনে অভিজাতভাবেই একেবারে ভারতীয় সিরিয়াল নাটকের বিয়ে বাড়ির মতোই সাজানো হয়েছে। যা ঢাকার জনগন দেখে খুবই আনন্দ সহকারে উপভোগ করেছে!

অন্যদিকে গত এক মাসে মিডিয়ায় দেখলাম, প্রায় ৫/৬ জন মানুষকে ঢাকার বিভিন্ন থানায় পুলিশ কতৃক বিভিন্ন কারনে হত্যার অভিযোগ এনেছে নিহতদের স্বজনরা। যদিও পুলিশ এ সকল ঘটনার দায় বাতিল করে দিয়েছে। এবং এ সকল নিহতদেরকে দাগি আসামী হিসেবে উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য এ সকল হত্যাকাণ্ডের একটির দায়ে এস.আই জাহিদ বর্তমানে কারাগারে আছে, তাকে মাননীয় আদালত রিমান্ডেও দিয়েছেন।
এখানে প্রশ্ন হলো, দাগি আসামী হলেই কি মেরে ফেলতে হবে? আর রবিনের ঘটনাস্থলেই বা পুলিশ কাকতালীয়ভাবে কী করে উপস্থিত ছিল? পুলিশ কি আগে থেকেই জানতো ওই দিন, ওই সময়ে, ওখানেই ছিনতাই হবে? তা না হলে সেদিন টিপু সুলতান রোডের ঘটনাস্থলে পুলিশ কী করে উপস্থিত থাকে? আমাদের দেশের পুলিশের সংখ্যা এমন স্তরে নাই যে প্রায় সকল এলাকা বা সব ঘটনাস্থলেই পুলিশের উপস্থিত থাকা সম্ভব! তাছাড়া একেবারে রবিনের দোকানের সামনেই বা কি করে ঘটনাটি ঘটলো, আর পুলিশওবা সেখানে কেনইবা ওই সময়েই দন্ডায়মান? বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয় নাকি আমাদের ভাগ্যরেখা পরিবর্তন হয়ে গেল? নাকি দেশে বর্তমানে পাব্লিকের মাথাপিছু পুলিশ বেড়ে গেল?
রবিনের বাবার অভিযোগের পেছনে দেশব্যাপী আদিকাল থেকেই কিছু সত্যতার মিল খুজে পাওয়া যায়। যেমন, দেখা গেছে অতীত থেকেই প্রত্যেক ঈদে ও পুলিশ সপ্তাহ সহ পুলিশের নানা অনুষ্ঠানে থানা-পুলিশ এলাকার প্রায় সকল ব্যবসায়ীমহল, ব্যবসাকেন্দ্র, বৈধ-অবৈধ ব্যবসায়ী, সামাজিক ব্যক্তিবর্গ, সরকারি চাকুরিজীবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দল থেকে চাঁদা নিয়ে থাকে। অবশ্য ঈদে পুলিশ ভাইয়েরা খুব মার্জিতভাবেই এ সকল ব্যক্তিকে বলেন, “দেখেন ঈদ আসছে। আপনারা তো বৌ-বাচ্চা নিয়ে ঈদ করবেন, কিন্তু আমাদের থানা ও পুলিশ লাইনের ভাইদের ঈদের কথা কি একটু চিন্তা করবেন না?”। রমজানে বলেন, “থানার সবাই মিলে একটু সেমাই চিনি খাবো”। আর কোরবানে বলেন, “একটু গরুর মাংস খাবো, সেজন্য কিছু টাকা দিয়ে সহায়তা করুণ”। অবশ্য দুর্বলতা আছে এমন ব্যক্তিভেদে কোথাও কোথাও সরাসরি টাকার অংকটা দাবি করে বসেন। কেউ যদি অপারগতা প্রকাশ করে, তখন পুলিশ ভাইয়েরা একটু বাঁকা করেই বলেন, “দেখেন আমাদেরকে কি আপনাদের কোন বিপদে লাগবে না?” ছোটখাট মানুষদের অবশ্য বলেন, “তুই কেমন করে কাজ/চলাফেরা করিস আমরা দেখে নেবো।” আর অবৈধ ব্যবসায়ীদের কিছু বলতেও হয় না, কী করতে হবে তা তারা বুঝে নেয়। বা পুলিশ ভাইদের বলেই দেয়, “ভাই আপনারা কি আমাদের কাছে চাইতে হবে? আমরাতো আছিই আপনাদের জন্য।” রাজনৈতিক নেতারা ভাবেন, পুলিশের হামলা-মামলার ব্যপার-স্যাপার আছে। নেতা-কর্মীদের বিপদে-আপদে এই ভাইদের লাগে। ইত্যাদি বিবেচনা করে একেবারে মিটিং করেই সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ ভাইদের উৎসবে কীভাবে টাকা দিয়ে সাহায্য করা যায়। এবং দরকার হলে পার্টির সবাই মিলেমিশে নিজেরা ভাগযোগ করেই পুলিশ ভাইদের চাঁদা দিয়ে ধন্য হন।
কী আর করা? পুলিশকে তো সবারই লাগে! যদি রাগ করে, তাহলে তো বিপদের আশংকা থেকে যায়। ইত্যাদি উপায়ে ঈদে পুলিশ টাকা উঠায়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, এক থানায় কত পুলিশ থাকে এবং কত টন সেমাই চিনির প্রয়োজন হয়? দেখা যায় যা সেমাই চিনি লাগে তার হাজারগুন সেমাই চিনির টাকা উঠে যায়। কোরবানে এক থানায় বড়োজোর একটি গরু লাগে কিন্তু উল্লেখিত উপায়ে থানা এলাকার আর্থিক গুরুত্ব ভেদে অন্তত ৫০/১০০/১০০০ টি গরুর টাকা উঠে যায় এই মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে! তাহলে পুলিশ ভাইয়েরা এই অতিরিক্ত টাকাগুলো দিয়ে কী করেন? এটা আম-আদমি জানতে চায়।
কী আর করা? পুলিশকে তো সবারই লাগে! যদি রাগ করে, তাহলে তো বিপদের আশংকা থেকে যায়। ইত্যাদি উপায়ে ঈদে পুলিশ টাকা উঠায়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, এক থানায় কত পুলিশ থাকে এবং কত টন সেমাই চিনির প্রয়োজন হয়? দেখা যায় যা সেমাই চিনি লাগে তার হাজারগুন সেমাই চিনির টাকা উঠে যায়। কোরবানে এক থানায় বড়োজোর একটি গরু লাগে কিন্তু উল্লেখিত উপায়ে থানা এলাকার আর্থিক গুরুত্ব ভেদে অন্তত ৫০/১০০/১০০০ টি গরুর টাকা উঠে যায় এই মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে! তাহলে পুলিশ ভাইয়েরা এই অতিরিক্ত টাকাগুলো দিয়ে কী করেন? এটা আম-আদমি জানতে চায়।
আমার উক্ত বর্ণনা যদি আংশিকভাবেও সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে রবিনের বাবার অভিযোগের সত্যতা আমরা বুঝে নিতে পারি কিনা? অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
গতকাল গাজী টিভিতে দেখলাম পুলিশের এক অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার বেনজির সাহেব জোর গলায় তার বক্তৃতায় বললেন, “আমরা দেশে রাজনীতির নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে দেবো না এবং আমরা তা নিকট-অতীতে সময়ে কঠিন হস্তে দমন করে সরকারকে নিরাপদে কাজ করতে সাহায্য করে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছি। ইনশাল্লাহ আগামীতেও সফল হব”। কথা কিন্তু ভালই বলেছেন কমিশনার সাহেব। আমরা এখন তার কাছে আশা করছি, তিনি যেন অতিদ্রুত আইজিপি হয়ে সারা দেশে ঈদের নামে থানায় থানায় সেমাই-চিনি ও গরু খাওয়ার পুলিশি চাঁদাবাজিটি বন্ধ করে অন্তত একটা ক্ষেত্রে হলেও সরকারের পাশাপাশি জনগনকেও একটু নিরাপদ করবেন।
