সালাউদ্দিন ভাই তুমি কি আর ফিরে আসবা না?


.

সালাউদ্দিন ভাই তুমি কি আর ফিরে আসবা না? তোমার জন্য, ইলিয়াস আলীর জন্য কিছু করতে না পারার যে কি যন্ত্রনা ও কষ্ট তা তোমাকে বুঝাতে পারবো না। দূরপথ থেকে তা তুমি টেরও পাচ্ছো না।

মানুষ শার্ট, টি শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, জ্যাকেট, সুয়েটার কিংবা স্যুট কত কিছুই পরে। আমিও এসব পরে আসছি। তুমি কিন্তু এসবের বাইরে সাফারিও পরো, যা রাষ্ট্রনায়ক জিয়া সবচেয়ে বেশি পরতো। কিন্তু তুমি হারিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস আগ থেকে আমার ভেতর একটি বায়না উঁকি দিচ্ছিল বার বার। তা হলো, এবার প্রকাশ্যে বের হলে তোমার মতো, জিয়ার মতো করে সাফারি পরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যাবো।

আমার এক বন্ধুকে বারবার বলছিলাম, 'সাফারি ভালো বানাতে পারে কোন টেইলার'? সে বললো, 'কেন'? আমি বললাম, 'সালাউদ্দিন ভাইয়ের মত সাফারি পরবো'। দুজনে আলাপ করে টেইলার পছন্দ করলাম, কাপড় ও কাপড়ের ধরনধারণ ঠিক করলাম। কিন্তু কি নির্মম! এর কয়েকদিন পরই তুমি নাই। তোমাকে ওরা তুলে নিয়ে গেল, স্বীকারও করলো না। তোমার বউ আর সন্তানেরা দৌঁড়াচ্ছে আর চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে। আমরা কিন্তু কেউই তোমার জন্য কিছু করতে পারলাম না! শুধু কাগজের বিবৃতি ছাড়া। আফসোস, এখন শুধু ভাবি, আমি কেন তোমার মত সাফারি পরতে চাইলাম?

২০০৬ সালে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল উদ্বোধনের সময়ও আমার পাশে ছিলেন সালাউদ্দিন ভাই। সেদিনও কাকতালীয়ভাবে তার গায়ে ছিল সাফারি স্যুট।

একবার বেগম জিয়ার রোডমার্চ ঢাকা থেকে বগুড়া- চাপাই নবাবগঞ্জ- কুষ্টিয়া হয়ে রাজশাহী গেল। রাজশাহী থেকে নাটোর হয়ে ঢাকা। আমি সেই রোডমার্চে সালাউদ্দিন ভাইয়ের সাথে তার একটা আরামদায়ক হায়েস গাড়িতে সঙ্গী হলাম। সিলেটের সাবেক ছাত্রনেতা বিপুলও আমাদের সাথে। সালাউদ্দিন ভাই যাত্রাপথে গাড়িতে কিছু কাগজপত্র নিয়ে উঠলেন। তার পরিকল্পনা ছিল, প্রায় তিন দিনের ভ্রমণে অন্তত এই কাগজপত্রগুলো দেখা হয়ে যাবে। পড়ে নিবেন।

যাত্রার শুরুতে তিনি আমাদেরকে বললেন আমি কিন্তু গাড়িতে কিছু পড়াশুনা করবো। আশা করি, তোমরা আমাকে ডিস্টার্ব করবেনা। আমরা বললাম, ওকে, আপনি আপনার কাজ করেন। আর আমরা আমাদের কাজ করবো। আশা করি সমস্যা হবে না। কিন্তু পথে পথে এতো মানুষের ঢল নামলো। মানুষকে হাত দেখানো, হাই বলা, ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়া, সে কি আনন্দ! এমন অবস্থায় আমি আর বিপুল নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারলাম না। সেই আনন্দে আমরাও মাতোয়ারা হয়ে গেলাম।

সালাউদ্দিন ভাই বার বার কাগজগুলো দেখতে চেষ্টা করেও পারছিলেন না। তার উপর আমার এলাকা থেকে এতো ফোন আসছিল! একটার পর একটা কল আসছেইতো আসছেই এলাকার নানা সমস্যা নিয়ে। ওখানে ওকে মারছে তো আরেকজনকে ধরছে। ওর বাড়ি ভাংচুর তো, আরেকজনের দোকান ভাংচুর। এভাবে চালাচ্ছে পুলিশ ও সরকারীদলের হামলা-নির্যাতন। মোবাইলে নেতা কর্মীরা এসব আমাকে জানাচ্ছিল। হয়তো, একটু সান্তনা ও পরামর্শ পাওয়ার আশায়। ফলে এতো কথা আর কথার মধ্যে সালাউদ্দিন ভাইয়ের পড়া গেল জলে। শুধু আফসোস করে বললো, 'তোদের সাথে আমার আসাই ঠিক হয়নি'। আর আমাকে বললো, 'তোমার এলাকায় এতো সমস্যা! কি করে সামলাচ্ছো'? বেচারা এমনিতেই কম কথা বলেন। আর আমাদের দু' জনের অত্যাচারে তার একটু নিদ্রাও যেন হারাম হয়ে গেল!

সালাউদ্দিন ভাই সিগারেট খান, তবে অতিরিক্ত না। আমি আবার অতিরিক্ত খাই, যদিও এখন আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। সালাউদ্দিন ভাই গত একমাস খেতে পেরেছে কিনা যদিও তা আমরা কেউ জানি না। তিনি আবার গাড়িতে সিগারেট খেতে পছন্দ করতেন না। তাই তার সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা জাগলে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে আমাকে বলতেন, 'চলো, বাহিরে নেমে সিগারেট খেয়ে আসি'। তারপর বাহিরে দু' জনে সিগারেট খেতে খেতে টুকটাক কথা বলতে বলতে গাড়িতে ফিরে আসা। এভাবেই চললো আমাদের নেত্রীর সাথে রোড মার্চের বহরের যাত্রা। এক ফাঁকে সালাউদ্দিন ভাইকে বলেই ফেললাম, আপনার সাফারিগুলো কোথায় বানান? সামনে কখনো আমিও আপনার এই ডিজাইনের সাফারি পরবো। তিনি 'তাই নাকি?' বলে মুচকি মুচকি হাসলেন। অসাধারণ ছিলো তার মুচকি হাসি। আজও সেই হাসিগুলো আমার চোখে ভাসছে।

এর আগে বগুড়ায় আমরা রাত্রী যাপন করলাম, বগুড়ার সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় হোটেলটিতে। কি জানি নাম হোটেলটির, ঠিক এই মুহূর্তে মনে আসছে না। আমাদের বগুড়ার স্থানীয় নেতা শোকরানা সাহেবের হোটেল। হোটেলে কিছু খোশগল্প করতে করতে আমি, সালাউদ্দিন ভাই, আন্দালিব রহমান পার্থসহ এক টেবিলে এবং পাশের টেবিলে মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা সবাই মিলে রাতের ডিনার শেষে রুমে গিয়ে কিছু আড্ডা ও রাজনৈতিক আলোচনা শেষে ঘুম দিলাম। এবং পরের দিন সকালে আবার রোড মার্চের যাত্রা শুরু। এভাবেই একসাথেই তিনদিন কাটিয়ে দিলাম লোকটার সাথে। কত কথা মনে পড়ছে আজ! কিন্তু সে নেই এবং আমরা এতোটা দুর্ভাগা যে, আজও জানতেও পারলাম না, সে কোথায়! ইলিয়াস আলী কোথায়! কেমন আছে কিংবা তারা আদৌ জীবিত কিনা।

প্রায় সব শেষে রাজশাহীর জনসভার পর নাটোর আসলাম আমরা রোডমার্চের বহরের সাথে। এরই মধ্যে পথে আমরা কঠিন ক্ষুধার্ত হয়ে গেলাম। যদিও সালাউদ্দিন ভাই অনেক শুকনো খাবার নিয়েছিলেন, আমরাও যার যার মত করে বেশ খাবার নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন কোথায় কিভাবে খাবো আমরা? অনেক রাত, হোটেল বা অন্য কোথাও খাওয়ার সুযোগ এবং পরিবেশ কোনটিই নাই। সব এলাকার নেতারাও ব্যস্ততম সময় পার করছে রোডমার্চকে ঘিরে। কি করা পেটের হাহাকার মানছে না আর। এরমধ্যে আমাদের অপর সঙ্গী বিপুল বলে উঠলো, আপনাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে, আমি সাধারণ ও স্বল্প পরিসরে খাওয়ার আয়োজন করতে পারি। তখন নাটোর পৌছতে আমাদের বেশি হলে আধা ঘন্টা সময় লাগবে। আমরা বললাম, কোথায় কিভাবে সেই আয়োজন হবে? বিপুল বললো, মাফ করবেন! এই মূহুর্তে আমি সেই কথা বলবো না। অনুমতি দিলে আমি এক্ষুনি রান্নার ব্যবস্তা করতে মোবাইলে জানিয়ে দিচ্ছি। আমাদের যাওয়ার পথে রাস্তার পাশেই। সালাউদ্দিন ভাই বললেন, নিরিবিলি ও কেউ না দেখে মত এমন একটা জায়গায় দুটো খাবার ব্যবস্থা হলে হয়। বিপুল মোবাইলে কোথায় জানিয়ে দিলো রান্নার জন্য আমাদের আর বুঝার সুযোগও হলোনা।

নাটোর শহরে পৌছার পর বিপুল আমাদেরকে নিয়ে গেল একবাড়িতে, সুন্দর ও মনোরম এক পরিবেশে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার তারা আমাদেরকে খাওয়ালেন! এতো অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা ঘটলো যে, আমরা হতবাক হয়ে গেলাম! খাওয়া শেষে জানলাম, ওই বাড়িটি বিপুলের শশুর বাড়ি এবং তার শশুর প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে নাটোরের এম.পি ছিলেন। তারপর আমাদের শেষ যাত্রায় আমরা ভোররাতে ঢাকায় পৌছালাম। সালাউদ্দিন ভাই আমাদের যার যার বাসায় নামিয়ে দিয়ে তিনি গেলেন তার বাসায়, তখন প্রায় সকাল। কিন্তু ভাই আজ তুমি নাই এটা চিন্তাই করতে পারছি না!

এই সালাউদ্দিন ভাইয়ের সাথে ১/১১ অবৈধ জরুরী সরকারের সময়ে কারাগারে একসাথে কাটানোর অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা মনে জমে আছে আজ। সংসদে, মন্ত্রনালয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কতো কাজ, কথা ও গল্প এখন শুধুই বেদনা।

ফেইসবুকের জন্য লেখাটি বড় হয়ে গেছে। কারাগার ও অন্যান্য অবস্থানের বর্ননা আজ আর দিলাম না। অন্য একদিন সুযোগ পেলে লিখবো। আরো দেবো ইলিয়াস আলীর সাথের কিছু বর্ননা।

বন্ধুগণ, যেই আবেগ নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, সেভাবে সালাউদ্দিন ভাইকে নিয়ে লেখাটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারলাম না, সরি।