Wed, 01 Jan, 2014 01:53:35 PM
নতুন বছরে মাহফুজ আনামের আহ্বান

গত ২৭ ডিসেম্বর শুক্রবার নির্বাচন কমিশন ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা ‘দয়া করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করবেন না’ শিরোনামে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। সেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা উচিত না, এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আজকে আমরা নতুন বছরের নতুন আশায়, অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, ভয়াবহ সহিংসতা ও প্রাণহানির আশংকায় আবারো আমাদের আবেদনের পুনরাবৃত্তি করছি ।
কারণ সংবিধানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি ভোটারদের আস্থা তৈরি এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা আমাদের দায়িত্ব। তাছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে তা অব্যাহত থাকলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি।
গত শুক্রবারের আবেদনে আমরা যেসব দিক তুলে ধরে ছিলাম তা হলো:
১. নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন দলের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করা উচিত। কারণ আইন অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই এই নির্বাচন করা সম্ভব।
২. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবম সংসদের অধিবেশন আহ্বান করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন যাতে তার নেতৃত্বে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা খুঁজে বের করা যায়।
৩. যদি নবম সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয় তবে বিএনপির উচিত হবে কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই সংসদে যোগ দেয়া এবং হরতাল, অবরোধের মতো সবধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সমঝোতা প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া উচিত।
৪. জামায়াতের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি হাইকোর্টের রায়ের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত।
কেন আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী এগুলো বিবেচনা করবেন এর জবাবে কিছু কারণ তুলে ধরছি:
১. ১৫৩ আসনে কোনো ভোট গ্রহণ ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ১৪৬ আসনে নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী সংসদ সদস্যদের জন্য গঠিত সংসদ কখনোই একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের মতো বৈধতা দাবি করতে পারে না। কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার শুধু তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আর খ্যাতি হারাতে পারে।
২. সংবিধানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচন হলো জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যা প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে হতে হবে। অথচ এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।
৩. নির্বাচনের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং আসংবিধানিক উপায় প্রতিরোধ করার যে যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে এসবই দুর্বল ভাবনা ছাড়া আর কিছুই না। এসব ভাবনা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া নির্বাচন স্থগিত করে ৯ম সংসদ অধিবেশনের আহ্বান করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে আইনগতভাবেই ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব।
৪. তাছাড়া ভোটারবিহীন এই নির্বাচন হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষ আস্থা হারাবে এবং এরফলে দেশের গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৫. এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি মৌখিকভাবে নির্বাচিত একদলীয় সরকার কায়েম
হবে। মানুষের ধারণা, আওয়ামীলীগ সেই লক্ষ্যেই এগুচ্ছে। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত
হলে আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ইমেজ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে
একটি সত্যিকারের প্রতিযোগিপূর্ণ নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত
করবে।
৬. আগামী ৫ নির্বাচনের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হতে পারে। আমরা
আবারো বলছি, যখন নির্বাচন শেষ হবে, তখন যেসব ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি তারা
সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রকাশ করবে। এই কারণে বিরোধীদলের পক্ষে সরাসরি
না হলেও পরোক্ষভাবে সমর্থন দেবে জনগণ। ভোট না দিতে পারায় ‘প্রতারণার’ শিকার
হয়ে জনগণ ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারে।
৭. একটি জোরপূর্বক ভোটারবিহীন নির্বাচনের চেয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আওয়ামী লীগকে আরো বেশি সাহায্য করবে।
৮. আওয়ামী লীগ ভুলে যেতে বসেছে যে আমাদের দেশের মানুষ সবসময়ই ক্ষমতাসীনদের
বিপক্ষে এবং নির্যাতিতদের পক্ষে সহানুভূতিশীল। সরকারের নেয়া দমন-পীড়নমূলক
ব্যবস্থার কারণে বিরোধীদলের ‘অসহায়ত্ব’ ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ব্যাপকভাবে
র্যাব, বিজিবি এবং পুলিশ মোতায়েন, বিরোধী দলের নেতাদের নির্বিচারে
গ্রেফতার, সরকারি দলের কর্মকাণ্ডে র্যাব এবং পুলিশের সুস্পষ্ট এবং ভয়ানক
সমর্থন ইত্যাদি ঘটনাগুলো বিরোধীদলকে সাধারণ মানুষের কাছে আরো ‘অসহায়’ করে
তুলছে।
৯. আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বচনে ভোটার সংখ্যা কম হতে পারে। কিছু
অতিমূল্যায়িত দলনেতা এবং সমর্থক এই বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন। এই
ঘটনা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির বিরুদ্ধে বিব্রতকর হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা যাই হোক না কেন তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর কারণগুলো হলো:
১. আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মানুষের মাঝে আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন
সম্পর্কে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি এক অর্থে খুব
বিপরীত হয়ে গেছে। ৫২ শতাংশ ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর
মানে দাঁড়ায় নয় কোটি ২০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি ভোটার এই
নির্বাচনে ‘জিততে’ পারবেন না। কারণ তারা নির্বাচনে অংশই নিতে পারছেন না।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই নির্বাচনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং ‘জনগণের ইচ্ছা’র
যে বহিঃপ্রকাশ তা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
২. বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, পাইকারি হারে গ্রেফতার,
পরোয়ানা জারি ইত্যাদি ঘটনাগুলো নির্বাচনী পরিবেশকে সম্পূর্ণ নষ্ট করেছে।
বিরোধী দলীয় নেতাকে শতাধিক পুলিশ পাহারায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
৩. রওশন এরশাদের মাধ্যমে এরশাদকে তার দল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে
সিএমএইচে রাখা হয়েছে। দলের ভাঙন তৈরির যে পদক্ষেপ তাও এই নির্বাচনকে
প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নতুন বছরের শুরু থেকেই বিরোধীদল অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিয়েছে।
এ অবস্থায় দেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক
দলগুলো যদি ছাড়া দেয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে না আসে তাহলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে
দেশের ভবিষ্যত।
