এরশাদের উপর মানুষ আস্থা রাখতে চেষ্টার উপায় খুঁজছে, কিন্তু মানুষ আনমনে ধাক্কা খেতে চায়। এর পরও নিজেদের মুষ্টিবদ্ধ করে, মনে জোর এনে, আস্থা আনার প্রচেষ্টায় মানুষ লিপ্ত। ভাবছে ঘুম থেকে উঠে কখন শুনেন এরশাদের নব বানী।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এরশাদের উপর খুবই বিরক্ত ও কষ্টবোধ লালন করি। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং এরশাদ- বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তার সরকার ও প্রশাসনের দ্বারা দেশের অন্যান্য আন্দোলনকামী মানুষের মত আমিও একজন ক্ষতিগ্রস্থ ও নির্যাতিত। এরশাদ পতনের চুড়ান্ত আন্দোলনের অংশ, ২৭ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অনেক ছাত্রদের নিয়ে আমিও চট্রগ্রাম থেকে ঢাকায় অংশগ্রহন করি। সে কি তুমুল আক্রমন আন্দোলনকারীদের দিক থেকে, তা চিন্তা করলে এখনও শরীর ও মন সেই রুপ ধারণ করতে চায়। সেদিন সচিবালয়ের কোন পাশেই তার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী এক জায়গায় ৫ মিনিট দাড়াতে পারেনি আন্দোলনকামী মানুষের প্রতিরোধের কাছে। মনে হয়েছে পিপীলিকার দলের মত তার বাহিনী ক্ষনে ক্ষনে পালিয়েছে আবার কচ্ছপের ন্যায় সামনে আসার চেষ্টা করেছে। লাশ পড়েছে আমাদের অনেক, আমাদের কেউ কেউ রনক্ষেত্র থেকে আহতদের নিয়ে প্রাণপণে ছুটে গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। আমিও সেদিন একটি লাশকে আহত ভেবে নিয়ে গিয়েছিলাম।
আমি ও আমার কয়েকজন সহযোদ্ধা সেইদিন উঠেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলে। ওই সময়ের সাহসী বীর, ছাত্র আন্দোলনের যোদ্ধা, শহীদ জিয়ার সংগ্রহশালার সেরা সেনাপতি বাবলু ভাই আমাকে জসীমউদ্দীন হলে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। সারাদিনের ক্লান্ত শরীরে ডাইনিং এ সামান্য খেয়ে, সবার সাথে সেদিনের বিভিন্ন ঘটনার কিছু গল্প করে, ঘুমাতে চলে গেলাম অচেনা কোন আন্দোলন সহকর্মীদের কক্ষে। পরদিন ঘুম থেকে উঠার আগেই পূর্ব আকাশে যখন সূর্য অগ্নি রুপ নিচ্ছে তখনই ছাত্রদের দৌড়াদৌড়ির শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠে দেখি এরশাদের সেনাবাহিনী হল ঘিরে ফেলেছে।
সেনাবাহিনী আমাদের অনেককে ট্রাকে পুরে নিয়ে যায় জেনারেল আবদুর রহমানের "ক আঞ্চলিক সামরিক আদালত" এ। এই আদালতটি তখন ভয়ঙ্কর এক নির্যাতন কেন্দ্র হিসাবে সুপরিচিত। আজকের শিশু পার্কের পাশেই এটির অবস্থান ছিল, শীতের নভেম্বর মাস, প্রচন্ড শীত। গায়ে থাকা সামান্য কাপড়ে খোলা আকাশের নিচে আমাদের দিনে রাতে অনেক দিন রাখলো খোলা মাঠে। খেতে দিতো না। বাকী নির্যাতের বর্ননা দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত।
আরেকদিনের একটি ঘটনা বলে এ সক্রান্ত বর্ননা শেষ করবো, কারন বড় লিখা পড়ার আগ্রহ হয়ত আপনাদের থাকবে না।
আমার ছোট বেলার প্রিয় মহকুমা শহর রামগড়, আমরা সেখানেও প্রচন্ড আন্দোলন করছিলাম এরশাদ বিরোধী। এরশাদের পুলিশবাহিনীর পাশাপাশি বিডিআরের সে কি আক্রমন ও নির্যাতন এরশাদ বিরোধীদের উপর, একদিন সকালে জাতীয় পার্টির লোকজনের সাথে আমাদের খুব হামলা, পাল্টা হামলা চলছে, পুলিশ-বিডিআর যৌথভাবে আক্রমন করলো আমাদের, এতে আমরা পিছু হটে আমার এক বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, বিডিআরের সিও [কমান্ডার] সেখান থেকে আমাকে তুলে এনে প্রকাশ্য লোকালয় দিয়ে শারিরীকভাবে কঠিনতর আঘাত করতে করতে তাদের ব্যাটালিয়নে নিয়ে যায়, পরে কারাগারে প্রেরন করে। আমি তখন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি।
এরশাদের এ রকম দেশব্যাপী নির্যাতনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এই কথা গুলো উল্লেখ করলাম এই জন্যই, তবুও দেশের বর্তমান এই সংকটময় মূহূর্তে মানুষ তার উপর দ্বিধাদ্বন্দ্বে হলেও একটু আস্থা রেখে আওয়ামী দুঃশাসনের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়। চায় একটি উপায় বের হয়ে আসুক, আ'লীগ বেকায়দায় পড়ে হলেও সরল পথে ফিরে আসুক এই আশায়।
এত কিছু বলার আমার একটাই উদ্দেশ্য এরশাদ সাহেবের মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা ? তার এমপি প্রার্থীরা মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করছে কিনা ?
গতকাল তার মহাসচিব জানালেন তারা ডাকযোগে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়েছেন। আমার প্রশ্ন, যদি তাই হয় এর কপি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জাতীর কাছে প্রকাশ করলেন না কেন ? ডাকযোগে প্রেরিত এইপত্র গুলো কত দিনে যাবে ? কতদিনে পাবে প্রধানমন্ত্রী ! এবং এর প্রাপ্তি স্বীকার আদৌ করছেন কিনা ?
যেই যুগে ডাক ব্যবহার একরকম বন্ধ হয়ে গেছে বললে চলে সেই আধুনিক টেকনোলজির দিনে এই পদত্যাগ পত্রগুলো কি ডাকের পাশাপাশি, ই-মেইল বা ফ্যাক্সেও পাঠাতে পারতেন না ? তাহলে জাতী এই সঙ্কট কালে একটু আশ্বস্থ হতে পারতো। এখন তো মানুষ চিন্তিত এই ডাকের নাটক কতদিন চলে তা ভেবে।
তাই এই পদত্যাগ পত্র প্রেরনের মাধ্যম ও প্রক্রিয়া দেখে আমার আজ, রুদ্র মোহাম্মদের কবিতা থেকে গানটির কথা বার বার মনে পড়ছেঃ
" ভাল আছি ভাল থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো "
এরশাদ সাহেবের কাছে আমার খোলা প্রশ্ন, আপনাদের পদত্যাগ পত্র গুলো 'আকাশের ঠিকানায়' পাঠালেন কিনা ??????।।
..................................................................
উপরের লেখাটি ফেবু তে লিখেছিলাম নয় ডিসেম্বর-দুই হাজার তের তারিখে, আজ একই মাসের ১৪ তারিখ। মনে হচ্ছে জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে কথাগুলো সত্যি হয়ে গেল!! তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারে অংশ গ্রহনকারী তাদের মন্ত্রিরা কেউই পদত্যাগ করেন নাই, বলেছিলেন পদত্যাগ পত্র ডাক যোগে পাঠিয়ে দিয়েছেন বরং দেখা যাচ্ছে এক জোটের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছে, তাদের নেতা এরশাদকে প্রথমে র্যাব দিয়ে আটক, পরে চিকিৎসা নাটক, ডাক্তার এবং চিকিৎসা ছাড়াই ভিআইপি মেঘনা ক্যাবিনে আপ্যায়নের জন্য অবস্থান ও ব্যবস্থা। এরশাদের প্রিয় ও বিশেষ কারনে যোগ্য মহাসচিব ও নবাগত মন্ত্রী বলেছেন এরশাদ সাহেব কে আটক করা হয়নি। শুনলাম পাঠাচ্ছে আরামের নির্বাসনে। দলীয় প্রার্থীরা বেশীর ভাগই তাদের ঘোষনা অনুযায়ী পদত্যাগের পরির্বতে জোটের একক প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছে। সিট ভাগাভাগির নির্বাচন, তাহলে এতো ত্যাগের বিনিময়ে কি দরকার ছিলো, জনগণ কে বোকা বানিয়ে ভোটের নাটক? এর মধ্যে জানাই গেলো বিনা প্রতিদ্ধন্দিতায় ১৫৪ এমপি হয়েই গেছেন নির্বাচন ছাড়া! তবে এমনিতে সিট যার যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে গেলেইতো পারতো সরকার। ওহ আচ্ছা কাগজে কলমে নামমাত্র নির্বাচনতো একটা দরকার, তা না হলে দেশ-বিদেশের মানুষতো আবার বলে বসবে আপনারা ক্ষমতায় কেমনে আইলেন?
হায়রে ক্ষমতা!!!!!!!!!!!!!
লিখাটি আমার ব্লগে তুলে রাখলাম।
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো!
.

Hm